পরামর্শ ও এস্তেখারা: গুরুত্ব ও আদবঃ মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৬, জুলাই, ২০২১, মঙ্গলবার
<strong>পরামর্শ ও এস্তেখারা: গুরুত্ব ও আদবঃ মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী</strong>

ওমর ফারুকঃ হামদ ও সালাতের পর যেকোনাে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করার পূর্বে শরীয়ত আমাদের দুটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছে।
এক. এস্তেশারা অর্থাৎ পরামর্শ করা।
দুই. এস্তেখারা।

শয়তান সর্বদাই মানুষের পেছনে লেগে থাকে আর শরীয়তের একেবারে সহজ সরল ও সাধারণ বিষয়ও বিকৃতরূপে উপস্থাপন করে। শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ের মতাে পরামর্শ ও এস্তেখারার রূপও সে বদলে দিয়েছে । অনেকে তো পরামর্শ ও এস্তেখারার ধার‌ই ধারে না। আর যারা কিছুটা ধার ধারে তাদের কর্মপদ্ধতিও ত্রুটিপূর্ণ। যেহেতু শরীয়তে এস্তেখারার তুলনায় পামর্শের গুরুত্ব বেশি তাই প্রথমে পরামর্শের গুরুত্ব ও প্রয়ােজনীয়তা এবং এতে যে সকল ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে সে সম্পর্কে আলােচনা করব। এরপর এস্তেখারার আলােচনা হবে ইনশাআল্লাহ।

—পরামর্শের গুরুত্ব ও প্রয়ােজনীয়তা সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীগুলাে শুনুন।

১. আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর আপনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। যখন ফায়সালা হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করুন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা ভরসাকারীদের ভালােবাসেন।”- সূরা আলে ইমরান। ০৩:১৫৯

দ্রষ্টব্য—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাে সর্বদাই আল্লাহ তাআলার হেদায়াত ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করতেন তা ছাড়া রাসূলের চেয়ে বুঝ, উপলব্ধি ও দূরদর্শিতা কার বেশি হতে পারে? তা সত্ত্বেও পরামর্শের গুরুত্ব ও প্রয়ােজনীয়তা বােঝানাের জন্য আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

০২. আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর যারা তাদের রবের নির্দেশ পালন করে, নামায কায়েম করে, পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করে এবং আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।”- সূরা শূরা। ৪২ : ৩৮

এখানে গুরুত্ব বােঝানাের জন্য নামায ও যাকাতের মতো মহান দুই ইবাদতের মাঝে পরামর্শের কথা আলােচনা করা হয়েছে। আর এ সূরার নামই রাখা হয়েছে ‘সুর শুরা’ অর্থাৎ পরামর্শের বিধান সংবলিত সূরা।

নামায ও যাকাত এমন দুই ইবাদত যে, কোরআন ও হাদীসে প্রায় সকল স্থানেই এ দুটি একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য এই দুই ইবাদতকে পরস্পরের সঙ্গী বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু কোরআনে কারীমে কেবল দুটি স্থানে নামায যাকাতের মাঝে তৃতীয় আরেকটি বিষয় উল্লেখ করে ওই বিষয়ের গুরুত্ব বােঝানাে হয়েছে। একটি হলাে ‘সূরা শুরা’য়। এখানে নামায ও যাকাতের মাঝে পরামর্শের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়টি হলাে ‘সূরা মুমিনূন’। এ সূরার শুরুতেই বলা হয়েছে, “অবশ্যই ওই সকল মুসলমান সফলতা লাভ করেছে, যারা খুশু-খুযুর সঙ্গে নামায আদায়, অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে আর যাকাত আদায় করে।- সূরা মুমিনূন: ১-৪

এখানে আল্লাহ তাআলা নামায ও যাকাতের মতাে মহান ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত দুটির মাঝে অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। বিষয়টির প্রতি বিশেষ গুরুত্বারােপের উদ্দেশ্যেই একে নামায ও যাকাতের মাঝে আলােচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলার সফল বান্দা তারাই, যারা এমন সব কাজ ও কথা থেকে বিরত থাকে যাতে না দুনিয়ার কোনাে ফায়দা আছে, না আখেরাতের।

পরামর্শ প্রসঙ্গে কোরআনে কারীমের দুটি আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে। এখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস শুনুন।

০১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিজের একক সিদ্ধান্তে কেউ সফল হয়নি। আর পরামর্শ করে কেউ কখনাে বিফল হয়নি।

(জামে সগীর ২/৩১, ইমাম বায়হাকী রহ. তাঁর হাদীসগ্রন্থ শুয়াবুল ঈমানে হাদীস নং: ৭১৩৭ হাদীসটি মুরসাল সনদে উল্লেখ করেছেন)।

০২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাযি. কে ইয়ামানের বিচারক করে পাঠানাের সময় এ উপদেশ দিয়েছিলেন, “পরামর্শ করে কাজ করবে। কারণ পরামর্শকারী (আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে) সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। আর যার পরামর্শ গ্রহণ করা হয় সে এ ব্যাপারে যিম্মাদার।

(জামেউল আহাদীস: ৯/২০ হাদীস। নং ৪০।)

—কার সঙ্গে পরামর্শ করব

নেককার ও দ্বীনদার ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করা চাই। পাশাপাশি ওই ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছুটা অভিজ্ঞতা থাকাও জরুরি।

নেককার অর্থ কী?

হয়তাে আপনারা জানেন, এমন ব্যক্তিকে নেককার বলা হয়, যে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। আল্লাহ তাআলার নাফরমানী থেকে নিজেও বিরত থাকে, অন্যদেরও বিরত রাখার চেষ্টা করে। যে দাড়ি সেভ করে ছেটে রাখে সে তাে প্রথম শ্রেণির ফাসেক। নেককার কখনােই নয়। এমনিভাবে যার ঘরে শরয়ী পর্দা নেই, খালাত, মামাত, ফুফাত, চাচাত ভাই-বােনদের সঙ্গে, দেবর, ভাসুর, বােন জামাই, ননদের জামাইদের সঙ্গে যার ঘরে পর্দা করা হয় না, সে তাে দাইয়ুস! এমন ব্যক্তি কখনােই নেককার হতে পারে না। চাই সে দৈনিক হাজার রাকাত নফল নামায পড়ুক। প্রতিবছর হজ করুক। এ ধরনের বে-দ্বীন ব্যক্তি কখনােই পরামর্শের উপযুক্ত নয়।

বে-দ্বীন থেকে পরামর্শ গ্রহণের ক্ষতি

এক. বে-দ্বীন ব্যক্তির বিচার-বুদ্ধি ও বিবেচনাশক্তি অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। গােনাহ ও নাফরমানী করতে করতে তাদের বিবেক-বুদ্ধি ও বিবেচনাশক্তি আঁধারে ছেয়ে যায়। তাতে কোনাে নূর থাকে না। তার অন্তরও অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিবেক-বুদ্ধিও অন্ধকারাচ্ছন্ন। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকেই চিনল না, সে আল্লাহ তাআলার বিধি-বিধান ও এর উপযােগিতা ও উপকারিতা কী করে বুঝতে সক্ষম হবে? তাই বে-দ্বীন নাফরমানের পরামর্শ গ্রহণ করবে না। তার পরামর্শে ক্ষতিরই আশঙ্কা রয়েছে। ফায়দার কোনাে সম্ভাবনা নেই।

দুই. বে-দ্বীন ব্যক্তি পরামর্শ গ্রহণকারীকে জেনে-বুঝে ভুল পরামর্শ দিতে পারে। পরামর্শ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে পরামর্শের জন্য নাফরমান ও বে-দ্বীনের ধারে-কাছেও যাবে না। পরামর্শ করতে চাইলে কোনাে নেককার ও দ্বীনদার মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করবে। দ্বীনদারীর পাশাপাশি যে বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করবে সে বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা আছে কিনা তাও দেখে নেবে। কেউ না জেনে কোনাে নেককার দ্বীনদার ব্যক্তিকে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ভেবে নেককার পরামর্শ চাইলে ওই নেককার ব্যক্তির উপর আবশ্যক হলাে, সে পরিষ্কার জানিয়ে দেবে, এ বিষয়ে আমার কোনাে অভিজ্ঞতা নেই। অতএব আমি পরামর্শ দিতে সক্ষম নই। সে তাকে এ কথা না জানালে বাহ্যিক দৃষ্টিতে নেককার হলেও প্রকৃত অর্থে সে নেককার নয়।
মানুষ পরামর্শের এ শর্তগুলাের প্রতি লক্ষ করে না। যার-তার সঙ্গে পরামর্শ করে।

—পরামর্শ গ্রহণকারীর ক্রটি

১- পরামর্শ গ্রহণকারীর প্রথম ত্রুটি হলাে, যে বিষয়ে পরামর্শ করতে চায়, আগে থেকেই ভেবেচিন্তে সে বিষয়ে মনে মনে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নেয়। এরপর কোনাে বুযুর্গের পরামর্শ চায়। বুযুর্গের পরামর্শ তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিলে গেলে বলবে, অমুক বুযুর্গের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করেছি। না মিললে বুযুর্গের পরামর্শের কোনাে তােয়াক্কা না করে নিজের পূর্বসিদ্ধান্তের উপরই অটল থাকে।

২- দ্বিতীয় ত্রুটি হলাে, পরামর্শদাতার কাছে বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করে না। কোনাে বুযুর্গ বা মুরব্বীর পরামর্শ গ্রহণের সময় বিষয়টির সকল ভালাে দিক এক এক করে উল্লেখ করতে থাকে। যেন পরামর্শদাতা তার পক্ষেই পরামর্শ প্রদান করেন। কিন্তু বিষয়টির অপর দিক উপস্থাপনই করে না যে, এতে কী কী ক্ষতি রয়েছে। বুযুর্গ থেকে নিজের পক্ষে পরামর্শ নিয়ে মানুষদের বলে বেড়ায়, অমুক বুজুর্গ এ পরামর্শ দিয়েছেন।

পক্ষান্তরে সে কাজটি করতে না চাইলে বিষয়টির সকল ত্রুটি ও ক্ষতির দিক এক এক করে বুযুর্গের সামনে উল্লেখ করতে থাকে। কিন্তু এর অপরদিক উল্লেখই করে না যে, এতে কী কী ফায়দা রয়েছে।পরামর্শের এ পদ্ধতি একেবারেই ভুল।

সঠিক পদ্ধতি হলাে, পরামর্শদাতার সামনে বিষয়টির লাভ-ক্ষতি উভয় দিক সঠিকভাবে উপস্থাপন করবে। তিনি উভয় দিক গভীরভাবে বিবেচনা করে উপযুক্ত পরামর্শ প্রদান করবেন। এখন তাে মানুষ সঠিক বিষয় উল্লেখ করে না। এভাবে পরামর্শের কী ফায়দা?
কোথাও কোনাে মেয়ে দেখে পছন্দ হয়ে গেল। এখন এল পরামর্শের জন্য যে, এখানে সম্পর্ক স্থাপন করবে কি না। তাে মেয়েপক্ষের প্রশংসা শুরু হয়ে গেল, মেয়ে খুবই ভালাে, মা-বাবাও খুব ভালাে। মূলত তাদের পুরাে বংশই খুব ভালাে! পরামর্শদাতার যদি মেয়েপক্ষ সম্বন্ধে অল্পবিস্তর জানাশােনা থাকে, তিনি তাদের কিছু মন্দ দিক তুলে ধরেন, তা হলে তাঁর পরামর্শ গ্রহণের পরিবর্তে তার বক্তব্য খণ্ডন করতে শুরু করে যে, না না হুযুর আপনি জানেন না। কেউ আপনাকে ভুল তথ্য দিয়েছে! বিষয়টি যেন এমন—সে পরামর্শদাতা থেকে কোনাে কিছু বুঝতে নয় বরং পরামর্শদাতাকে কিছু বোঝাতে এসেছে!

অনেক সময় আমার কাছে কেউ পরামর্শের জন্য এলে তার কথাবার্তায় স্পষ্ট বুঝতে পারি, সে আমার মুখ থেকে এ কথা বের করতে চায়, হ্যাঁ হ্যাঁ, এটা ঠিক আছে! তার কথা থেকেই পুরােপুরি নিশ্চিত হয়ে যাই এবং বুঝতে পারি, এ কেবল নামমাত্র পরামর্শ করতে এসেছে। যেন সে বলতে পারে, আমি পরামর্শ করেই কাজ করেছি!

বিষয়ের লাভ-ক্ষতি উভয় দিক বিস্তারিত উল্লেখ করার পরিবর্তে কেবল একটি দিক উল্লেখ করে পরামর্শ করা আজকাল মানুষের স্বভাবে পরিণত হয়েছে।

৩- পরামর্শ গ্রহণকারী তৃতীয় যে ভুলটি করে তা হলাে, অনেক ক্ষেত্রে পরামর্শদাতা কোনাে পরামর্শ দিলে তা পরামর্শের পরিবর্তে নির্দেশ মনে করে।
পরামর্শদাতা তাে পরিস্থিতির বিবরণ শুনে কেবল এ পরামর্শ দিয়েছে যে, আপনি যা বর্ণনা করেছেন তা থেকে এ কাজ করাই ভালাে মনে হচ্ছে। এটা শুধুই পরামর্শ। পরামর্শদাতা তা পালনে তাকে বাধ্য করে না। তাকে কোনাে প্রকার নির্দেশও প্রদান করে না যে, এটাই করুন। কিন্তু সে পরামর্শগ্রহণের পর লােকদের বলতে থাকে, অমুক আমাকে এমনটি করতে বলেছেন। অমুক বুযুর্গ আমাকে বলেছেন এ কাজ করতে, তাই করছি!
আরে ভাই, তিনি কখন আপনাকে নির্দেশ করলেন! সিদ্ধান্ত তাে আপনি নিজেই গ্রহণ করলেন। ওই বুযুর্গ তাে আপনাকে শুধু এ কথাই বলেছেন, আপনার বর্ণনা অনুযায়ী অমুক কাজ করাই ভালাে মনে হয়। অতএব তা করাই ঠিক হবে। বুযুর্গ তাে এ কাজটিকে বেশির থেকে বেশি উত্তম বলেছেন। তিনি কেন বলতে যাবেন, এ কাজ করা আপনার উপর ফরয! আপনাকে অবশ্যই এটা করতে হবে!
কিন্তু পরামর্শগ্রহীতা মানুষকে বলে বেড়ায়, অমুক বুযুর্গ বলার কারণে করছি। এটা অবশ্যই ওই বুযুর্গের প্রতি মিথ্যা অপবাদ।

৪-চতুর্থ ত্রুটি হলাে, পরামর্শমতাে কাজ করার পর ফায়দা হলে আর সে বুযুর্গের কথা বলে না। তাঁর নাম আলােচনায় আনে না। বরং নিজের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করতে থাকে।
যেমন নাকি কারুন বলত, ‘যা কিছু আমি উপার্জন করেছি তার সবই নিজের জ্ঞান-বুদ্ধির জোরেই করেছি।’
একই অবস্থা আজকালের পরামর্শগ্রহীতাদের। পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে কোনাে ফায়দা হলে ওই বুযুর্গের কথা আর মনে থাকে না যার পরামর্শ গ্রহণ করেছিল বা যাকে দিয়ে দুআ করিয়েছিল। বরং নিজের যােগ্যতা ও জ্ঞান-বুদ্ধির কথাই বলতে থাকে যে, যত ফায়দা হয়েছে তা আমার নিজের জ্ঞান বুদ্ধি ও প্রচেষ্টার ফসল। পক্ষান্তরে ফায়দার পরিবর্তে (আল্লাহ না করুন) ক্ষতি হয়ে গেলে এর সকল দায়ভার ওই বুযুর্গের কাঁধে চাপিয়ে দেয় যে, আমি এ কাজ নিজ সিদ্ধান্তে করিনি; বরং অমুক বুযুর্গের পরামর্শে করেছি।
শুধু তা-ই নয়; আরেকটু আগ বেড়ে বলে, হযরতই তাে আমাকে এ কাজ করতে বলেছেন। অতএব আমাকে এ জন্যে তিরষ্কার করার কোনো কারণ নেই। আমি তাে হযরতের নির্দেশ পালন করেছি মাত্র!
তাে সবখানে এ কথাই বলে বেড়ায়, এটা হযরতের নির্দেশ ছিল। তার পরামর্শেই এ কাজ করা হয়েছে।

—পরামর্শদাতার ত্রুটি

পরামর্শদাতা যে ভুলের শিকার হন
১. কিছু লােক পরামর্শ প্রদানে এতটাই আগ্রহী থাকে যে, অযথাই কারও পেছনে লেগে থাকে আর পরামর্শ চাওয়া ব্যতীত নিজ থেকেই পরামর্শ দিতে থাকে। এমন কাউকে পরামর্শ দিতে যাবেন না, যে আপনার কাছে পরামর্শ চায়নি। আবার এমন কাউকেও পরামর্শ দিতে যাবে না, যার কাছে আপনার পরামর্শের কোনাে গুরুত্ব নেই।

২. পরামর্শ গ্রহণ করতে পীড়াপিড়ি করা এবং পরামর্শ গ্রহণ না করলে অসন্তুষ্ট হওয়া।
এটা মারাত্মক ভুল। পরামর্শের মূলকথা নিজের মত প্রকাশ করা মাত্র। কেউ তা গ্রহণ করুক বা না করুক এতে সমস্যার কিছু নেই।

এস্তেখারার গুরুত্ব

এ পর্যায়ে এস্তেখারার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস শুনুন।

হাদীস নং: ১
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ততটা গুরুত্বসহ এস্তেখারা শিক্ষা দিতেন যতটা গুরুত্বসহ শিক্ষা দিতেন কোরআন শরীফের সূরা।”-জামে তিরিমিযী : ৪৮০

হাদীস নং: ২
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বনী আদমের একটি দুর্ভাগ্য হলাে আল্লাহ তাআলার কাছে এস্তেখারা না করা।-জামে তিরমিযী : ২১৫১

—এস্তেখারার সুন্নত তরীকা

সুন্নত তরীকায় এস্তেখারার সহজ পদ্ধতি হলাে, প্রথমে দুই রাকাত নফল নামায পড়বে। এরপর এস্তেখারার দুআ পড়বে। ব্যস, এস্তেখারার দুআতে যতগুলাে শব্দ রয়েছে তার সবগুলাে এখানে উদ্দেশ্য। দুআ নিম্নরূপ:

اللهم اني استخيرك بعلمك واستقدرك بقدرتك و اسألك من فضلك العظيم، فإنك تقدر ولا أقدر وتعلم ولا أعلم وانت علام الغيوب، اللهم ان كنت تعلم أن هذا الأمر خير لي في ديني ومعاشي وعاقبة امري فقدره و يسره لي ثم بارك لي فيه، وان كنت تعلم أن هذا الأمر شر لي في ديني ومعاشي عاقبة أمري فاصرفه عني اصرفني عنه واقدر لى الخير حيث كان ثم أرضني به

আরবী দুআ মুখে উচ্চারণের সময় অর্থ ও উদ্দেশ্যের প্রতিও মনােযােগ রাখবে। বিশেষত সর্বশেষ বাক্যের অর্থ। বাক্যটির অর্থ হলাে, হে আল্লাহ, যে বিষয়ে আমি আপনার কাছে এস্তেখারা করছি, যদি তা আপনার ইলম অনুযায়ী আমার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য—বর্তমানেও এবং ভবিষ্যতেও—উপকারী ও কল্যাণকর হয়, তাহলে আমার জন্য তা নির্ধারণ করে দিন। আমার জন্য তা সহজ করে দিন এবং তাতে বরকত দিন। আর যদি তা আমার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে আমার থেকে তা ফিরিয়ে নিন এবং আমাকেও তা থেকে ফিরিয়ে দিন। অর্থাৎ আমি তা করতে চাইলেও যেন করতে না পারি। তার উপায়-উপকরণ দুষ্কর করে দিন। যেন কোনোভাবেই তা ফলপ্রসূ না হয়। যেখানেই আমার কল্যাণ রয়েছে তা আমার জন্য নির্ধারণ করে দিন। এরপর আমাকে তাতে সম্রষ্ট থাকার তাওফীক দানু করুন।

এস্তেখারা বলতে যা বােঝায় তা এতটুকুই যে, দুই রাকাত নফল নামায পড়ে দুআ করে নেবে। এরপর সামনে যা কিছু হবে তাতে কল্যাণ রয়েছে। কাজ হলে তাে তাতে কল্যাণ রয়েছে আর না হলে কল্যাণ নেই। এস্তেখারার পর মন যেদিকে ঝুঁকবে আর যে কাজের পথ খুলে যাবে, মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখতে হবে, এতেই কল্যাণ রয়েছে। যদি মনের আকর্ষণ দূর হয়ে যায় অথবা সে কাজের উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা না হয়, কিংবা উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা তাে ছিল, কিন্তু এস্তেখারার পর হাতছাড়া হয়ে যায়, তা হলে পূর্ণ আশ্বস্ত থাকুন। এবং আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে, এতেই আমার কল্যাণ হবে। আমার মন খুব চায় কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমার লাভ ও ক্ষতি কিসে তা ভালোভাবেই জানেন। এ চিন্তা মাথায় থাকলে সহজেই আশ্বস্ত হতে পারবেন। এস্তেখারার পর যদি কোনো দিকেই মনের বিশেষ আকর্ষণ অনুভব না করেন, তা হলে বাহ্যিক উপকরণের ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হবে, তাতেই কল্যাণ হবে।
এস্তেখারার পর কোনাে ক্ষতি হলে এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, এ সামান্য ক্ষতির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মারাত্মক কোন ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছেন। এস্তেখারার দুআয় দুনিয়ার আগে দ্বীনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, মুসলমানের দ্বীন হলাে মূল। আর দুনিয়া তাে দ্বীনের অনুগামী।

—এস্তেখারায় জোড়াতালি

দেখুন এস্তেখারা কত সহজ। কিন্তু শয়তান এতেও বিভিন্ন বিষয় জুড়ে দিয়েছে।

১—দু-রাকাত নামায পড়ে কারও সঙ্গে কথাবার্তা না বলে শুয়ে পড়বে। শােয়া জরুরি। অন্যথায় এস্তেখারা বেকার।
২—শুতে হবে ডান কাতে।
৩—কেবলামুখী হয়ে শুতে হবে।
৪—শোয়ার পর স্বপ্নের অপেক্ষায় থাকো। এস্তেখারা করা কালীন স্বপ্ন দেখবে।
৫—স্বপ্নে অমুক রং দেখলে এ কাজ ভালাে হবে আর অমুক রং দেখলে বুঝতে হবে তা কল্যাণকর নয়।
৭—স্বপ্নে কোনাে বুযুর্গের আগমন ঘটবে। বুযুর্গের অপেক্ষায় থাকতে হবে। তিনি এসে সবকিছু বলে দেবেন।
ভাবনার বিষয় হলাে এ বুযুর্গ কে এবং কেমন? যদি শয়তানই বুযুর্গ সেজে আসে তা হলে সে কী করে বুঝবে যে এটা শয়তান না বুযুর্গ? মনে রাখবেন, এগুলাের কোনােটিই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। কোনাে কোনাে লেখক কোনােরকম তাহকীক ছাড়াই কিতাবে লিখে দিয়েছেন। আল্লাহ এ লেখকদের রহম করুন!

—এস্তেখারার মনগড়া পদ্ধতির কুফল

আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে এস্তেখারার যে পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পদ্ধতিই উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু আজকালের মুসলমানরা আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত সে পদ্ধতির বিপরীতে নিজেদের পছন্দমতাে বিভিন্ন রকমের পদ্ধতি আবিষ্কার করে নিয়েছে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত পদ্ধতির উপর তাদের আস্থা ও ভরসা নেই। এগুলোর মন্দ দিক হলো,

১. আল্লাহ তাআলার সঙ্গে মােকাবিলা। আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশিত পথ ও পন্থার বিপরীতে নিজের কোনাে পদ্ধতি আবিষ্কার করা আল্লাহর ইলমের উপর নিজের ইলমকে প্রাধান্য দেওয়ার নামান্তর।

২. সুন্নত পরিত্যাগ। এতে কোনাে সন্দেহ নেই যে, শয়তান মানুষকে সুন্নত থেকে দূরে সরিয়ে তার বিপরীতে যা কিছু তাদের অন্তরে ঢেলে দেয়, তা তাে শয়তানের গােলামদের কাছে অত্যন্ত কার্যকরই মনে হবে। কিন্তু আল্লাহর গােলামদের কাছে খড়-কুটার মতােই এগুলাের কোনাে মূল্য নেই।

—অন্য কারও মাধ্যমে এস্তেখারা করানাে

এস্তেখারার ক্ষেত্রে মানুষ আরেকটি ভুলের শিকার হয়। এ ভুলটিও শোধরানাে প্রয়ােজন। ভুলটি হলাে, অনেকেই নিজে এস্তেখারা করার পরিবর্তে অন্যকে দিয়ে এস্তেখারা করায়। এ তরিকাও গলদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশনা হলাে, প্রয়ােজন যার সে নিজেই এস্তেখারা করবে। অন্যকে দিয়ে এস্তেখারা করানাে শরীয়তে প্রমাণিত নয়।

মানুষের ধারণা হলাে, আমরা তাে গােনাহগার। আমাদের এস্তেখারার কী মূল্য রয়েছে। তাই অমুক আলেম, বুযুর্গ বা নেককার ব্যক্তিকে দিয়ে এস্তেখারা করানাে হলে তাতে বরকত হবে! এ ধারণা ভুল। যার প্রয়ােজন সে নিজেই এস্তেখারা করবে। চাই সে নেককার হােক বা গােনাহগার।

বিয়ে-শাদীর সম্বন্ধের ব্যাপারে এস্তেখারা

বিয়ে-শাদীর সম্বন্ধের বিষয়টি অন্যান্য বিষয় থেকে ভিন্ন। এটা কেবল ছেলে-মেয়েদের বিষয়ই নয়, পিতা-মাতারও বিষয়। সঠিক ও উপযুক্ত সম্বন্ধ তাে পিতা-মাতাই নির্বাচন করতে পারেন। এটা তাদের দায়িত্ব। তাদেরই এ নিয়ে ভাবতে হয় যে, কোথায় সম্বন্ধ করবে। এ জন্য উত্তম হলাে, যে ছেলে বা মেয়ের বিয়ে, সে নিজেও এস্তেখারা করবে। তার পিতামাতা জীবিত থাকলে তারাও এস্তেখারা করবে।

গােনাহগার ব্যক্তি এস্তেখারা করবে কীভাবে

গােনাহগার ব্যক্তি এস্তেখারা করতে পারে না— মানুষের এ ধারণা দুই কারণে সঠিক নয়।
প্রথম কারণ, গােনাহ থেকে বিরত থাকা আপনার আয়ত্তাধীন বিষয়। মুসলমান হয়েও আপনি কেন গােনাহগর? গোনাহ হয়ে গিয়ে থাকলে খাঁটি দিলে তওবা করুন, গোনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যাবেন। তখন আর গােনাহগার থাকবেন না, নেককারদের কাফেলায় শামিল হয়ে যাবেন। তওবার বরকতে আল্লাহ তাআলা আপনাকে পবিত্র করে দেবেন। আপনি আল্লাহ তাআলার এ দয়া ও অনুগ্রহের মর্যাদা রক্ষা করুন। ভবিষ্যতে জেনেবুঝে আর গোনাহ করবেন না।
দ্বিতীয় কারণ, এস্তেখারার জন্য শরীয়ত এমন কোনাে শর্ত আরােপ করেনি যে, এস্তেখারা কেবল আল্লাহর ওলীগণই করবেন, গােনাহগাররা এস্তেখারা করতে পারবে না। শরীয়ত যে শর্ত আরােপ করেনি আপনি নিজ থেকে তা আরােপ করতে পারেন না। শরীয়তের নির্দেশ হলাে, যার প্রয়ােজন সে যেন এস্তেখারা করে নেয়। চাই সে গােনাহগার হোক বা নেককার। সে যেমনই হােক নিজে এস্তেখারা করবে।
আল্লাহ তাআলা সকল মুসলমানকে তাঁর মারেফাত ও মহব্বত দান করে তাদের আকল-বুদ্ধি এ পর্যায়ে উন্নীত করুন যে, ছােট থেকে ছােট কোনাে গােনাহের চিন্তা আসামাত্রই লজ্জায় সংকুচিত হয়ে যায়।

খুতুবাতুর রশীদ থেকে অনূদিত ও সংক্ষেপিত।মাসিক নেয়ামত। ফেব্রুয়ারি ২০২১।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 8
    Shares