ইউসুফ খান থেকে দিলীপ কুমার,এক কিংবদন্তী বলিউড অভিনেতা

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৮, জুলাই, ২০২১, বৃহস্পতিবার
ইউসুফ খান থেকে দিলীপ কুমার,এক কিংবদন্তী বলিউড অভিনেতা

অনলাইন ডেস্কঃ মুহাম্মদ ইউসুফ খান – বুধবার ৯৮ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন ভারতের মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে। তার ছয় দশকের ক্য্যারিয়ারে তিনি ৬৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

তাঁর স্ত্রী বলিউডের আরেক অভিনেত্রী সায়রা বানু বিবিসিকে প্রয়াত অভিনেতার কিছু ছবি দিয়েছেন। এছাড়াও দিলীপ কুমারের পুরনো সহকর্মী ও বইয়ের প্রকাশকদের সৌজন্যে বিবিসি হিন্দির পাওয়া কিছু দুর্লভ ছবি, পাশাপাশি এজেন্সির ছবি দিয়ে এখানে সাজানো হয়েছে দিলীপ কুমারের বর্ণময় কর্মজীবন।

বহু বিয়োগান্তক ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে ‘ট্র্যাজেডি কিং’ বা ট্র্যাজেডির রাজা নামে খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন অভিনেতা দিলীপ কুমার।

পেশাওয়ারের ফল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সারোয়ার খানের পুত্র মুহাম্মদ ইউসুফ খানের জন্ম বর্তমানে পাকিস্তানি এই শহরে ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে।

দিলীপ কুমারের প্রথম ছবি ‘জোয়ার ভাটা’ ১৯৪৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল। বম্বে টকিস-এর এই ছবিটির পরিচালক ছিলেন অমিয় চক্রবর্তী। ছবিতে দিলীপ কুমারের সাথে অভিনয় করেছিলেন মৃদুলা রানী, শামীম বানু, রুমা গুহঠাকুরতা প্রমুখ।

ইউসুফ খান ১৯৪৩ সালে যখন ‘বোম্বে টকিজ’-এ চাকরি খুঁজতে গিয়েছিলেন, তখন সেখানকার স্বত্বাধিকারী দেবিকা রানী তাকে অভিনেতার হওয়ার প্রস্তাব দেন।

তখনই নাম বদলে সিনেমার পর্দায় তার নাম দিলীপ কুমার রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
রোমান্টিক ছায়াছবি ‘দিদার’ মুক্তি পায় ১৯৫১ সালে।

ওই ছবিতে অভিনয়ের পর দিলীপ কুমার বোম্বে চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় ‘ট্রাজেডি কিং’ নামে পরিচিত হয় ওঠেন। দিদার-এর পরিচালক ছিলেন নীতিন বোস। ছবিতে দিলীপ কুমারের সাথে অভিনয় করেছিলেন অশোক কুমার, নার্গিস আর নিম্মি।

অভিনয়ের কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না দিলীপ কুমারের। কিন্তু অভিনয় ছিল তার সহজাত। তার জীবনে অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয় তার তৃতীয় ছায়াছবি ‘মিলন’।

মিলন তৈরি হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ‘নৌকাডুবি’র কাহিনি অবলম্বনে।

এই ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি পরিচালক নীতিন বোসের সান্নিধ্যে আসেন। দিলীপ কুমার নিজে বলছেন, নীতিন বোস তাকে অভিনয়ের কলাকৌশল শিখিয়েছিলেন, শিখিয়েছিলেন কীভাবে কথা না বলেও আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়।

দিলীপ কুমার পরবর্তীকালে তার অভিনয় জীবনে যে ভূমিকায়ই অভিনয় করেছেন, সেখানে চরিত্রের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দিয়েছেন।

তবে ১৯৬০ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা ‘মুঘল-এ-আজম’ দিলীপ কুমারের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

মুঘল-এ-আজম ছিল ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র। কে আসিফ পরিচালিত এই ছবির অন্য তারকারা ছিলেন পৃথ্বীরাজ কাপুর, মধুবালা এবং দুর্গা খোটে।
মুঘল-এ-আজম ছিল রাজপুত্র সালিম – যিনি পরে পরিচিতি পান মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর হিসেবে – এবং রাজনতর্কী আনারকলির প্রেম কাহিনি। সালিমের পিতা সম্রাট আকবর তাদের প্রেমের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি এবং এর পরিণতিতে ঘটেছিল পিতা ও পুত্রের মধ্যে লড়াই।

দিলীপ কুমার অভিনয় করেছিলেন সালিমের ভূমিকায়।

পাকিস্তানের পেশাওয়ারে যেখানে দিলীপ কুমারের জন্ম, সেখানে এখনও এই কিংবদন্তী অভিনেতার প্রচুর ভক্ত রয়ে গেছে। ১৯৯৭ সালে দিলীপ কুমারকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত করা হয়।

পাকিস্তানের পেশাওয়ারে বৃদ্ধ দোকানী মুহাম্মদ দ্বীন পকোড়া বেচেন। তার দোকানের সর্বত্র ছড়ানো দিলীপ কুমারের ছবি।

দ্বীন দিলীপ কুমারের সবক’টি ছবি দেখেছেন।

পাকিস্তানে ২০০৬-এর এপ্রিলে লাহোরের গুলিস্তান সিনেমা হলে মুঘল-এ-আজম ছবিটি যখন দেখানো হয়, তখন ছবিটি দেখতে টিকেটের জন্য লম্বা লাইন পড়ে গিয়েছিল।

পাকিস্তানের পেশাওয়ারে দিলীপ কুমারের যে পৈতৃক বাড়ি ছিল তার বয়স ১০০ বছরের বেশি। সে বাড়ি আজ ধ্বংসপ্রায়। তবে পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিমে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কর্তৃপক্ষ বাড়িটি সংস্কার করে সেখানে একটি যাদুঘর তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে।

পেশাওয়ারে শতাব্দী প্রাচীন এক বাজারে কাছে দিলীপ কুমারের পৈতৃক বাসভবন-সহ আরও কিছু বলিউড সুপারস্টারের পৈতৃক ভিটের দশা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল।

দিলীপ কুমার বিয়ে করেছিলেন বলিউডের আরেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী সায়রা বানুকে। নিচের ছবিটি চলচ্চিত্র গোপীর। সায়রা বানুর সাথে ১৯৭০-এ এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন দিলীপ কুমার।

গোপী ছাড়াও দিলীপ কুমার সায়রা বানুর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন ‘সাগিনা’ এবং ‘বৈরাগ’-সহ আরও কয়েকটি ছবিতে।

সাগিনা মাহাতো ছবিটি বাংলাতে তৈরি হয়েছিল ১৯৭০ সালে। তপন সিংহ পরিচালিত ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন দিলীপ কুমার ও সায়রা বানু। ১৯৪২-৪৩এর শ্রমিক আন্দোলনের সত্যি ঘটনা ছিল এই ছায়াছবির কাহিনি।

শিলিগুড়ি শহরের এক কারখানার ট্রেড ইউনিয়ন নেতা সাগিনা মাহাতোর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দিলীপ কুমার। ছবিটি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে তপন সিংহ একই ছবি তৈরি করেন হিন্দি ভাষায় সাগিনা নাম দিয়ে। নায়ক নায়িকা ছিলেন একই – দিলীপ কুমার ও সায়রা বানু।

দিলীপ কুমার ও সায়রা বানু বিয়ে করেন ১৯৬৬ সালে।

সায়রা বানু দিলীপ কুমারের থেকে ২২ বছরের ছোট ছিলেন। বিবিসিকে ২০১৮ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সায়রা বানু বলেছিলেন যে এমনকি এই বৃদ্ধ বয়সেও ‘দিলীপ সাহেব’-এর চোখের ভাষা তিনি পড়তে পারেন।

বলিউড মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চন সবসময় দিলীপ কুমারকে তার অভিনয় জীবনের আরাধ্য হিসাবে দেখেছেন। দুই সুপারস্টার এক সাথে অভিনয় করেছেন মাত্র একটি চলচ্চিত্রে। ১৯৮২ সালে রমেশ সিপ্পির পরিচালনায় শক্তি-তে।

দিলীপ কুমার ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত দেবদাস, আন, আন্দাজ, কোহিনূর, ফুটপাথ, পয়গম, মধুমতী, লিডার এবং মুঘল-এ-আজমের মত বিখ্যাত সব ছবির মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা ও সাফল্য পান, পাশাপাশি অভিনয়ের জন্য পান রসিক-সমালোচকদের প্রশংসা।

তিনি যে শুধু ট্র্যাজেডির রাজা হিসাবে দর্শকের হৃদয় জয় করেছিলেন তাই নয়, বহু কমেডি ছবিতেও তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

অভিনয়ের জন্য দিলীপ কুমার যত পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন, ভারতের আর কোন অভিনেতা এখনও তা পাননি।

বিজয়বাংলা/এনএম/৮/৭/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন