তামিলনাডু-তে ইসলামের উত্থান

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৯, জুলাই, ২০২১, শুক্রবার
<strong>তামিলনাডু-তে ইসলামের উত্থান</strong>

সফওয়ান বিন বাশারঃ হিন্দুধর্মমতে হিন্দু সমাজের চারটি শ্রেণির সর্বনিম্ন শ্রেণি। সর্বোচ্চ শ্রেণি হলো ব্রাহ্মণ, এরপর ক্ষত্রিয়, তারপর বৈশ্য। শূদ্ররা আদিকাল থেকেই তাদের উপরের তিন শ্রেণি দ্বারা নির্যাতিত ছিল, এখনও আছে। তাঁরা এখনো হিন্দু সমাজে অছুঁত বা অস্পৃশ্য হিসেবে বিবেচিত। জীবনচলার প্রতিটা ক্ষেত্রে তাঁরা উচ্চ শ্রেণির হিন্দুদের দ্বারা লাঞ্ছনা ও বৈষম্যের শিকার।

শূদ্রদের প্রতি আর্যদের বিদ্বেষ ও ঘৃণার সামান্য কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো :

◑ চণ্ডাল তথা শূদ্র শ্রেণির লোকেরা শহরের বাইরে বসবাস করবে। তাঁরা মাটির পাত্র ব্যবহার করবে। পশুপালনে তাঁরা শুধু গাধা ও কুকুর পালন করতে পারবে। মৃতদের কাফন সদৃশ পোশাক ব্যবহার করতে পারবে। অলংকার হিসেবে শুধু লোহা ব্যবহার করতে পারবে। তাঁরা শুধু নিজেদের মধ্যেই লেনদেন করতে পারবে এবং রাতে কোনো শহরে বা গ্রামে চলাফেরা করতে পারবে না।
[প্রহাদয়োতা, ১০/৫১-৫৪]

◑ ব্রাহ্মণদের মনঃকষ্টের কারণ হওয়ায় শূদ্ররা নিজেদের প্রয়োজনের অধিক সম্পদ সঞ্চয় করতে পারবে না।
[প্রহাদয়োতা, ১০/১২৯]

◑ শূদ্রদের জন্য কোনো ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণ বৈধ নয়।
[প্রহাদয়োতা, ১০/১২৪]

◑ ব্রাহ্মণদের শূদ্র স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান উত্তরাধিকার লাভ করবে না।
[প্রহাদয়োতা, ৯/১৫৫]

◑ ঈশ্বর শূদ্রকে উপোর্যুক্ত তিন শ্রেণির সেবা করার নির্দেশ দিয়েছেন, এতে সে কোনো সংকোচ অনুভব করতে পারবে না।
[প্রহাদয়োতা, ১/৯১]

ভারতের একটি প্রদেশ ‘তামিলনাড়ু’তে অস্পৃশ্যদের জন্য রামাস্বামী নাইকার নামে এক লোক ‘দ্রাভিড়ার কাঝাগাম’ (Dravidar Kazhagam) নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এটির মাধ্যমে অস্পৃশ্যরা ইসলাম, খ্রিষ্ট ও বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে অধ্যয়নের সুযোগ পায়। দলিতদের (অস্পৃশ্য) বেশিরভাগই অন্যান্য ধর্মের বিপরীতে ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। কারণ, ইসলামে স্রষ্টা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। এবং তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। কিন্তু তাদের ইসলাম গ্রহণ সংঘবদ্ধভাবে ছিলো না। পরবর্তীতে আলিম ও দা’ঈগণ ব্যপকভাবে দা’ওয়াত ও তাবলীগে মনোনিবেশ করেন। তাঁরা তামিল ভাষায় অনেক ইসলামী বই অনুবাদ করেন। ফলে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে এবং সারা ভারতে ইসলাম গ্রহণের সংবাদ ব্যাপক হইচই ফেলে দেয়।

১৯৮১ সাল। ‘মিনাকাশিপুরাম’ তামিলনাড়ু প্রদেশের একটি ছোট্ট গ্রাম। জনসংখ্যা বেশি না, ৯৪৫ জন। তন্মধ্যে ৫৫৮ জনই ইসলাম গ্রহণ করে। তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতির মান অন্যদের চেয়ে উন্নত। তাদের মধ্যে দুজন ডাক্তার, একজন ইঞ্জিনিয়ার ও বেশ কয়েকজন প্রফেসর রয়েছেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ -তে তাঁরা তাদের গ্রামের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম ‘রহমতনগর’ রাখেন। তাদের বলা হয়েছিল, ভারত সরকার তোমাদের সব ধরনের সরকারি সুবিধা বাতিল করে দেবে। তখন তাঁরা সমস্বরে বলেছিল, আমরা সম্মানের জীবনযাপনের জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমরা সব ধরনের সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে প্রস্তুত।
[তামিলনাড়ুর দৈনিক পত্রিকা Daily Dina Malar, ২৫ জুন ১৯৮১ সংখ্যা]

জনৈক সরকারি কর্মকর্তা ঘোষণা দিয়েছিল— দলিতদের ইসলাম গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সব সরকারি সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে– বিনামূল্যে শিক্ষা, উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, সরকারি চাকরিতে ১৮% সংরক্ষিত কোটা। এর পাশাপাশি সরকারিভাবে তাদের কৃষিকাজ ও বাসস্থান নির্মাণের জন্য ঋণ প্রদান করা হয়। যারা ইসলাম গ্রহণ করবে, তাঁরা এসব সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।
[দৈনিক পত্রিকা Daily Dina Malar, ২৯ জুন ১৯৮১ সংখ্যা]

তামিলনাড়ুতে হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণের পুরোটাই ছিল, দলিতদের (অস্পৃশ্য) প্রতি হিন্দুদের অত্যাচারের প্রভাব। দলিত নেতা ‘ভেলু’ ঘোষণা করেছিলেন, “আরও পঞ্চাশ (৫০) হাজারের মতো দলিত হিন্দু ইসলাম গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। তাঁরা মনে করে, ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যা তাদের হিন্দুত্ববাদের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম।”
[‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’, ৩০ জুন ১৯৮১ সংখ্যা]

কেউ কেউ দাবি করত, দলিতদের (অস্পৃশ্য) ব্যাপকহারে ইসলামে দীক্ষিত হওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের অংশ। আর্যসমাজের তিনজন বড় নেতা ভারত সরকারের কাছে আর্যদের মধ্যে ইসলাম প্রসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেছিলো। অন্যথায় তাঁরা নিজেরাই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। তাঁরা আরো দাবি তুলেছিল, যেন দক্ষিণ-ভারতে নওমুসলিমদের মধ্যে ইসলামী শিক্ষার প্রচার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করা হয়।

এ সংক্রান্ত বিষোদগারপূর্ণ প্রতিবেদনটি উর্দু সংবাদপত্র ‘প্রতাপ’ এর ২ জুন ১৯৮১ এ প্রকাশিত হয়েছিলো।

কট্টর হিন্দুত্ববাদী সম্পাদক দ্বারা সম্পাদিত এই পত্রিকাটি দাবি করে বসেছিলো যে— হিন্দু সংগঠনগুলো নও-মুসলিমদের খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছে, এদের পেছনে নাকি বহিঃরাষ্ট্রের হিন্দু-বিরোধী ষড়যন্ত্র কাজ করছে। আরব রাষ্ট্রগুলো দলিতদের ইসলামে দীক্ষিত করতে অঢেল সম্পদ ব্যয় করেছে। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, হাজার হাজার হিন্দু নারী ইতিমধ্যে আরব দেশগুলোতে গৃহকর্মী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে, হয়তো তাঁরাও অচিরেই ইসলাম গ্রহণ করবে।

কিন্তু এর পুরোটাই ছিলো মিথ্যা, বানোয়াট এবং ভারত সরকারের কূটকৌশল মদদিত। এর মাধ্যমে উক্ত পত্রিকাটি ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাতে চেয়েছিল। এটি ভারত সরকারের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দারুণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

ইসলামে দীক্ষিত জনৈক নওমুসলিম ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাদের উপর আরোপিত এই অপবাদের চরমভাবে বিরোধিতা করে বলেছেন যে—
“কেউ যদি এ কথার প্রমাণ করতে পারে, আমি ইসলাম গ্রহণের বিনিময়ে কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা নিয়েছি, তাহলে আমি মৃত্যুদণ্ড মেনে নিতে প্রস্তুত।…. ভারতবাসী যদি নিরাপদ ও শান্তিতে বসবাস করতে চায়, তাহলে তাদের ইসলামে দীক্ষিত হওয়া উচিত।”

পরে জানা যায়, ভারত সরকারের হাতে এই মর্মে কোনো প্রমাণ নেই যে, দলিতদের জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। পুরোটাই ছিল গুজব ও ভিত্তিহীন।
[‘হিন্দুস্থান টাইমস’, ০৫ মে ১৯৮১ সংখ্যা]

‘মাদ্রাজ’ থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি পত্রিকার প্রতিনিধি ইসলামে দীক্ষিত অঞ্চলগুলো ভ্রমণের মাধ্যমে সেখানকার একটি চিত্র প্রতিবেদনে ফুটিয়ে তোলেন—

নতুনভাবে ইসলামে দীক্ষিতরা বেশ জোরেশোরে এ কথার বিরোধিতা করেছে যে, তাদের জোর করে ইসলামে দীক্ষিত করা হয়েছে অথবা ইসলাম গ্রহণের বিনিময়ে তাদের কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বলেছে, ‘আমরা স্বেচ্ছায় ইসলামে দীক্ষিত হয়েছি এবং এটাও বুঝেছি যে, ইসলাম সত্যধর্ম। মানুষ অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে ইসলামের সাম্যের বাণী গ্রহণ করে। অসংখ্য স্রষ্টার উপাসনা থেকে মুক্তি পেতে এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমর্পিত করে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। আল্লাহভীরুতার মাধ্যমেই মানুষের মর্যাদা নিরূপিত হয়।
[‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’, ১৭ জুন ১৯৮১ সংখ্যা]

‘হায়াত’ নামে একটি সংবাদপত্র “দলিতদের ইসলাম গ্রহণ নিয়ে শোরগোল কেন” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। পত্রিকাটি প্রশ্ন তুলেছিল–
// ভারতজুড়ে দলিতদের অবস্থান কী পশুদের চেয়েও জঘন্য ছিলো না ? স্বাধীনতার পরে ভারত সরকার তাদের অবস্থার উন্নয়নে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল ? আর যখন এই দলিত শ্রেণি ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে, তখন কেন চারদিকে শোরগোল ও চ্যাঁচামেচি শুরু হয়েছে ? //
[‘হায়াত’, ২১ জুন ১৯৮১ সংখ্যা]

একসময়ের শুধুমাত্র অস্পৃশ্য হিন্দু ও খ্রিষ্টান অধ্যুষিত ‘তামিলনাড়ু’তে আজ অর্ধ কোটিরও বেশি মানুষ মুসলিম। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হিদায়াতের পথে পরিচালিত করেন। আল্লাহু আকবার !
.
#দ্বীনে_ফেরার_গল্প

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 3
    Shares