প্রসঙ্গ: খেলাধুলা ও একটি প্রতিশোধ

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১২, জুলাই, ২০২১, সোমবার
<strong>প্রসঙ্গ: খেলাধুলা ও একটি প্রতিশোধ</strong>

খালিক উদ্দীনঃ কবি নির্মলেন্দু গুণ একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন-
‘তোমাকে স্পর্শ করতে গিয়ে
কতবার যে গুটিয়ে নিয়েছি আমার হাত
সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন!
অনেকটা সেরকম করে আমিও বলছি একটা সময় এই খেলার জন্য কী না করেছি আমি- সে কথা আমার এলাকার কতগুলো ভাই-বেরাদার জানে!
ঐ সময়টায় বাবাকে এবং পড়াশোনাকে আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শত্রু মনে হত। এ কারণেই মনে হত- হয়তো পড়াশোনার কারণে বাবা আমার এসব বাড়াবাড়ি ধরনের খেলাধুলা একদম পছন্দ করতেন না। সেই মানসে একদিন রেগে গিয়ে আমার একটা ক্রিকেট খেলার ব্যাটকে তিনি কেটে রীতিমতো কুচিকুচি করে দিয়েছিলেন। আর এই কুচি করা কাঠ গুলো পেয়ে মা হয়তো রান্না করতে গিয়ে খুবই খুশী হয়েছিলেন। কিন্তু, তিনি জানতেন না এগুলো নিছক কাঠ নয়, তাঁর পুত্র ধনের দুমড়ানো মোচড়ানো হৃদয়! 🤣

তাছাড়া অনেক সময় ইচ্ছে করে কোনো এক কাজে বাবা আমাকে এনগেজড রেখে দিতেন, যাতে আমি প্রখর রোদের মধ্যে খেলতে যেতে না পারি।
আমি নাছোড়বান্দাও কম যাইনি। একবার কোনো রকম উনার হাত থেকে ফসকে যেতে পারলে মিসাইল গতিতে ব্যাট বল নিয়ে মাঠে দিছি দৌড়। গোটা বিকেল খেলতে খেলতে সাধ মিটিত না। গ্রামের ছোট ছোট ভাই ভাতিজাগুলোর (যারা অনেকেই আজ বিয়ে করে বড় হয়ে গেছে 🤣) প্রতি অনেকটা জেনারেলের মত কমান্ড ছুড়ে দিয়ে বলতাম- তোরা যা, যার যার বাড়ি থেকে চার্জার লাইটার নিয়ে আয়। আজ শর্ট পিচে রাত ৯ টা ১০ টা পর্যন্ত খেলা চলবে!
ওরাও আমার সঙ্গদোষে খেলাধুলায় আসক্ত হয়ে পড়াতে আমার নির্দেশ পাওয়া মাত্রই উসাইন বোল্টের মতো দৌড়ে গিয়ে তাদের বাবা-মা’র শত আর্তনাদ উপেক্ষা করে চার্জার লাইটার নিয়ে আসতো। আর ঠিক তখন থেকেই তাদের বাবা কিংবা মা হয়তো আমাকে অভিশাপ দেওয়া শুরু করে দিতেন! 🤣
একজন একদিন বলেছিল ভাই, আমার কাল পরীক্ষা, আমি আজ রাতব্দি খেলতে পারব না। বললাম, রাখ তোর পরীক্ষা। এসব পড়াশোনার গোষ্ঠী কিলা। আজ রাতে না খেললে আগামী তিনদিন তুই খেলার মাঠে নিষিদ্ধ। অবশ্য ব্যাট বলের মালিক হওয়ার জন্য নয়, এমনিতেই ওরা আমাকে খুব মানতো, শ্রদ্ধা করত। মাঝেমধ্যে ব্যাটিং ছাড়া ফিল্ডিং বোলিং করতে করতে শেষতক মন খারাপ করেও বাড়ি চলে যেত, কিন্তু একটুও উচু শব্দ করত না।
তো শাস্তির ভয়ে বেচারা তার পড়াশোনাকে ঐ রাতের জন্য গলা টিপে হত্যা করে তিন দিন নিজেকে নিষিদ্ধ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে ছিল।
এভাবে আরো কত কিছু….!

আজ মাত্রা বছর পনেরো একের ব্যবধানে সেই আমি এমনভাবে বদলে গেলাম- এই যে কোপা আমেরিকা গেল, ইউরোও যাচ্ছে, বিশ্বকাপও আসে, মানুষের মনে তীব্র আবেশ উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে আবার চলেও যায়।
এমনকি মাঝেমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে রক্তাক্ত প্রান্তর বানিয়েও সে চুপিসারে কেটে পড়ে!
কিন্তু, আমি যেন নির্বিকার। একবারও এতোটুকুন ইচ্ছে জাগে না যে অন্তত একবারের জন্যেও টিভির পর্দায় দেখে আসি মেসি কিভাবে ডিগবাজি খেয়ে গোল পুশ করে, কিংবা ১২ নাম্বার খেলোয়াড় হয়ে রেফারি কার পোস্টে গোল পুশ করায়ে দিল, অথবা হারের ধায় এড়াতে নেইমার কোন ভঙ্গিমায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে!
এ যেন আমি অনুভূতিহীন এক অসাড় মানুষে রূপ পরিগ্রহ করেছি!

আজ বাবাও নেই। নিজেও বেশ বড় হয়ে গেছি। এতোটা বড় হয়েছি যে চাইলে সারাদিন রাত খেলতে পারি কিংবা খেলা দেখতে পারি, কেউ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে আসবে না।
কিন্তু হায়, সেই প্রেষণা কবেই উবে গেছে! আজকাল খেলাধুলার প্রতি মোটেও কোনো অনুভূতি কাজ করে না।
আসলে এর কারণ কী?
বহু ভেবে চিন্তে দেখলাম কারণ একটাই- ‘ঐ যে চার্জার লাইটার নিয়ে আসা ছেলেগুলোর মা-বাবা যে অভিশাপ দিয়েছিলেন মনে মনে,সেই অভিশাপ আজ বিশ বছর পরে এসে আমার অনুভূতিতে ভর করেছে। এবং পড়াশোনাকে তাচ্ছিল্য করার অপরাধে আজ অহর্নিশ আমাকে বইপত্র ঘাটাঘাটি করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। সে কারণেই হয়তো এতো সাধের খেলাধুলা আজ আপন হৃদয়ে এতো পরবাসী হয়েছে! এবং মনে মনে একসময় ভীষণ শত্রু ভাবা আমার বাবাকে এবং পড়াশোনাকে আজ এতো প্রিয়ভাজন হিসেবে ধারণ করে নিতে হয়েছে!
সত্যিই, মানুষ মানুষকে হয়তো ছেড়ে দেয়, মানুষ মানুষের অনেক কিছু মনে রাখে, আবার অনেক কিছু ভুলেও যায়।
কিন্তু, প্রকৃতি কিছুই ভুলে না। ছাড়ও দেয় না। কমও দেয় না, বেশিও দেয়া না। যার যা প্রাপ্য, একদিন সুদে আসলে তা মিটিয়ে দেয়। প্রয়োজন কেবল সময়ের একটু ব্যবধানের।
তাই, আমিও এক সময়কার অপরিপক্ক মানসে বাবাকে ও পড়াশোনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শত্রু ভাবার খেসারত দিচ্ছি।
সেই অপরাধের দায়ভার আজ শিরা-উপশিরায় বহন করে চলতে হচ্ছে।
কিন্তু, কোথায় গেল আমার এতো সাধের খেলাধুলার মানসিকতা !!!

কোপা আমেরিকার বিজিত অবিজিত উভয় দলের সমর্থকদের আমার অনুভূতিশূন্য অসাড় হৃদয়ের একরাশ সমবেদনা ও অভিনন্দন !

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন