দখলদারদের পলায়নের পর আফগানীদের জীবনযাত্রা

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৪, জুলাই, ২০২১, বুধবার
দখলদারদের পলায়নের পর আফগানীদের জীবনযাত্রা

ইন্টারন্যশনাল ডেস্কঃ যুক্তরাষ্ট্র ও নেটোর সৈন্যরা ২০ বছরের যুদ্ধের পর অবশেষে আফগানিস্তান ত্যাগ করছে। যে তালেবানকে পরাজিত করতে তারা এদেশে এসেছিল – সেই তালেবানই এখন দ্রুতগতিতে দেশটির বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিচ্ছে।

এই যুদ্ধ কীভাবে আফগানিস্তানকে বদলে দিয়েছে, আগামীতেই বা কী ঘটতে যাচ্ছে?

তালেবান কি ফিরে এসেছে?
তালেবান নামের মৌলবাদী ইসলামপন্থী মিলিশিয়া বাহিনীটি ২০০১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল – যখন মার্কিন-নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তানে অভিযান চালায়। এর পর দেশটিতে গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়, এবং একটি নতুন সংবিধান গৃহীত হয়।

কিন্তু তালেবান এর পর এক দীর্ঘ বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু করে। ক্রমান্বয়ে তারা আবার শক্তি সঞ্চয় করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো বাহিনীকে আরো বেশি করে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলে।

এখন মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে তাদের সবশেষ সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

আর ঠিক এ সময়টিতেই তালেবান বহু জেলা পুনর্দখল করে নিচ্ছে, এবং সেখানে তাদের কঠোর শরিয়া আইন পুনরায় বলবৎ করছে।

এই মানচিত্রে যে এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে তা নিয়ে বিতর্ক আছে বলে দেখানো হয়েছে – সেগুলোতে হয় যুদ্ধ চলছে, নতুবা জেলাটির কিছু অংশে তালেবানের জোরদার উপস্থিতি রয়েছে।

বাস্তব অবস্থা নিয়ত পরিবর্তনশীল। অনেক জায়গায় বাইরের কারো প্রবেশাধিকারও সীমিত। তাই রিপোর্ট যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন।

কিন্তু এটা স্পষ্ট যে তালেবান নতুন নতুন এলাকা দখল করছে, এবং মনে করা হয় যে আফগানিস্তানের এক তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণই এখন তাদের হাতে।

২০০১ সালের পর থেকে কত লোক নিহত হয়েছে?
গত ২০ বছরের লড়াইয়ে আফগানিস্তানে এবং সীমান্তের ওপারে প্রতিবেশী পাকিস্তানে উভয় পক্ষেই হাজার হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছে। এই সংঘাতের মধ্যে পড়ে বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছে – কখনো তালেবানের আক্রমণে, কখনো কোয়ালিশন বাহিনীর বিমান হামলায়।

এ বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের প্রথম তিনমাসে বেসামরিক লোক নিহত হবার সংখ্যা এক বছর আগেকার তুলনায় ‘অনেক বেশি’ ।

জাতিসংঘের দিক থেকে বলা হচ্ছে, এর কারণ হলো ঘরে তৈরি বোমা বা আইইডি’র ব্যবহার এবং আগে থেকে আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করে চালানো হত্যাকাণ্ড।

আফগানিস্তানে ২০২০ সালে যত বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন তার মধ্যে ৪৩ শতাংশই নারী ও শিশু।

কত লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন?
বছরের পর বছর ধরে চলা সহিংস সংঘাতের কারণে লক্ষ লক্ষ লোক বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। অনেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন, অথবা আরো দূরের কোন দেশে আশ্রয় চেয়েছেন।

অনেকে আফগানিস্তানের ভেতরেই ছিন্নমূল এবং গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

আরো বহু লক্ষ মানুষকে ব্যাপক দুর্ভোগ ও অনাহারের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।

গত বছর লড়াইয়ের কারণে বাস্তুচ্যুত হন চার লক্ষেরও বেশি লোক। তা ছাড়া ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়েছেন প্রায় ৫০ লক্ষ লোক – এবং তারা দেশে ফিরতে পারেননি। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে যে দেশগুলোতে বাস্তুচ্যুত লোকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি – তাদের মধ্যে আফগানিস্তান হচ্ছে তৃতীয়।

আফগানিস্তানের দেশব্যাপী সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে করোনাভাইরাস মহামারি। লকডাউন ও লোক চলাচলের ওপর নানা বিধিনিষেধ জারির ফলে অনেক মানুষের অর্থ উপার্জনের ক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে – বিশেষ করে এটা ঘটেছে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক দফতর বলছে, আফগানিস্তানের ৩০ শতাংশেরও বেশি লোক খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতি বা সংকটজনক স্তরে রয়েছে।

মেয়েরা কি এখন স্কুলে যেতে পারছে?
তালেবানের পতনের ফলে আফগানিস্তানে নারী অধিকার ও শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও অগ্রগতি হতে পেরেছিল।

উনিশশো নিরানিব্বই সালে দেশটিতে মাধ্যমিক স্তরের স্কুলে একটি মেয়েও ভর্তি হয়নি। প্রাইমারি স্কুলে যেতো মাত্র ৯,০০০ মেয়ে শিশু।

দু’হাজার তিন সাল নাগাদ ২৪ লক্ষ মেয়ে স্কুলে যাচ্ছিল। এখন দেশটিতে স্কুলে যাচ্ছে এমন মেয়ের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লক্ষ। তা ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশই মেয়ে।

কিন্তু ইউনিসেফের তথ্য মতে, আফগানিস্তানে এখনো ৩৭ লক্ষ শিশু স্কুলে যায় না, এবং তার ৬০ শতাংশই মেয়ে।

এর প্রধান কারণ হচ্ছে চলমান লড়াই, আর পর্যাপ্তসংখ্যক স্কুল ও নারী শিক্ষকের অভাব।

তালেবান বলছে, এখন তারা আর নারী শিক্ষার বিরোধী নয়। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যেসব এলাকা এখন তালেবান নিয়ন্ত্রণে সেগুলোতে খুব কম তালেবান কর্মকর্তাই মেয়েদেরকে বয়ঃসন্ধির পর স্কুলে যাবার অনুমতি দেন।

নারীদের সুযোগ অনেক বেড়েছে
আফগানিস্তানে নারীরা এখন সরকারি কর্মকাণ্ডেও অংশ নিচ্ছেন, তারা রাজনৈতিক পদে আসীন হচ্ছেন এবং অনেকে ব্যবসা করছেন।

দু’হাজার উনিশ সাল নাগাদ এক হাজারেরও বেশি আফগান নারী তাদের নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেছেন – যা তালেবান শাসন কায়েম থাকলে নিষিদ্ধ হতো।

জীবনধারায় কতটা পরিবর্তন এসেছে?
আফগানিস্তানে অবকাঠামো সংক্রান্ত অনেক সমস্যা থাকলেও মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে।

আফগানিস্তানে নারীদের কাজের সুযোগ অনেক বেড়েছে
ছবির ক্যাপশান,
আফগানিস্তানে নারীদের কাজের সুযোগ অনেক বেড়েছে

জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত জনসংখ্যার ২২ শতাংশ বা ৮৬ লাখেরও বেশি লোকের ইন্টারনেট আছে। লক্ষ লক্ষ লোক এখন সামাজিক মাধ্যমও ব্যবহার করছেন।

মোবাইল ফোনের ব্যবহারও বাড়ছে – দেশটির ৬৮ শতাংশ লোকই এখন মোবাইল ফোনের মালিক।

তবে জাতিসংঘ বলছে, মোবাইল সেবায় অনেক সময়ই বিভ্রাট ঘটে এবং তা যোগাযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

আফগানিস্তানে প্রাপ্তবয়স্কদের ৮০ শতাংশেরই কোন ব্যাংক এ্যাকাউন্ট নেই। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মধ্যেও এই হার অনেক বেশি।

এর কারণ হিসেবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছাড়াও – বিশ্বব্যাংক বলছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসও প্রভাব ফেলে। আরো দুটি কারণ হলো, অর্থখাতের ওপর লোকের আস্থার অভাব এবং আর্থিক খাতে সাক্ষরতার নিম্ন হার।

অবশ্য বিশ্বব্যাংক মনে করছে, নতুন কিছু প্রকল্পের কারণে আগামী পাঁচ বছরে এ্যাকাউন্টধারী আফগানের অনুপাত বেড়ে যাবে।

রাজধানী কাবুলে গত ২০ বছর অনেকগুলো বহুতল ভবন উঠেছে, শহরের জনসংখ্যাও বাড়ছে।

গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রে আছে আফিম চাষ
আফগানিস্তান হচ্ছে আফিমজাত মাদক পণ্যের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী।

ব্রিটেনের কর্মকর্তারা মনে করেন, যুক্তরাজ্যে যে হেরোইন মাদক আসে তার ৯৫ শতাংশেরই উৎস হচ্ছে আফগানিস্তান।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায় গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে পপি চাষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশটির ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে মাত্র ১২টি হচ্ছে পপি চাষ-মুক্ত।

পপি চাষ বন্ধ করার জন্য চাষীদের নানা ধরনের বিকল্প পণ্য যেমন আনার ও জাফরান চাষের জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু তার পরও এই অবস্থা।

যদিও তালেবান ২০০১ সালে পপি চাষের ওপর কিছুকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল – কিন্তু এটা এখন তাদের জন্য (এবং অন্যদের জন্যও) কোটি কোটি ডলারের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

পপি চাষীদের প্রায়ই তাদের আয়ের জন্য জঙ্গীদেরকে কর দিতে বাধ্য করা হয়।

পপি চাষ যে বাড়ছে – তার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং কর্মসংস্থানের অভাবকে প্রধান কারণ বলে মানা হয়।

বিজয়বাংলা/এনএম/১৪/৭/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন