প্রবন্ধ-১ ‘সূরায়ে মূলকঃ আল্লাহর সৃষ্টি নৈপুণ্য, আল্লাহভীরুদের শুভ পরিণাম ও কুফরের ভয়াবহতা’

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৫, জুলাই, ২০২১, বৃহস্পতিবার
<strong>প্রবন্ধ-১ ‘সূরায়ে মূলকঃ আল্লাহর সৃষ্টি নৈপুণ্য, আল্লাহভীরুদের শুভ পরিণাম ও কুফরের ভয়াবহতা’</strong>

নরিন জাহান শম্পাঃ সূরা মূলক পবিত্র আল-কুরআনের ২৯ নং পারার ৬৭ তম সূরা যার আয়াত সংখ্যা ৩০ ও রুকু সংখ্যা ২। সূরা মূলক এর নামকরণ করা হয়েছে এর প্রথম আয়াতাংশ থেকে। মূলক( الۡمُلۡکُ) যার বাংলা অর্থ সার্বভৌম কর্তৃত্ব এবং( تَبٰرَکَ الَّذِیۡ) অর্থ বরকতময় সত্তা অর্থাৎ, আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন প্রশংসা ও ক্ষমতার উল্লেখ করে সূরাটি শুরু হয়েছে।

নাযিলকাল:
এ সূরাটি কোন সময় নাযিল হয়েছিলো তা কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায় না। তবে বিষয়বস্তু ও বর্ণনভংগী থেকে সুষ্পষ্ট বুঝা যায় যে, সূরাটি মক্কী জীবনের প্রথম দিকে অবতীর্ণ সূরা সমূহের অন্যতম।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কুরআন মাজিদে ৩০ (ত্রিশ) আয়াত বিশিষ্ট একটি সুরা রয়েছে, যা তার তেলাওয়াতকারীকে ক্ষমা করে দেয়ার আগ পর্যন্ত তার জন্য সুপারিশ করতেই থাকবে। আর সুরাটি হলো تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ অর্থাৎ সুরা মুলক। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)

আল্লাহর সৃষ্টির নৈপুণ্য সূরা মূলকের আলোকে:
কখনো কি ভেবে দেখেছি কত সুন্দর ও কোনোরূপ খুঁটি বিহীন মস্ত বড় আকাশ আমাদের মাথার উপর রয়েছে! এটাই প্রিয় রবের সৃষ্টি তিনি স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাতটি আসমান তৈরি করেছেন। যার মধ্যে নেই কোন অসংগতি ও ত্রুটি অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্ট এ পৃথিবীতে কোন জিনিসই সামঞ্জস্যহীন খাপছাড়া নয়। মানুষ যতবারই দৃষ্টি দিক কোন ক্ষুদ এর মধ্যে সে খুঁজে পাবে না।

রাতের আকাশে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন তারকারাজির খেলা এবং আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের নিকট আসমানকে সজ্জিত করেছেন সুবিশাল প্রদীপমালা দ্বারা। নিকট আসমান অর্থ যে আসমানের তারকা ও গ্রহরাজি আমরা খালি চোখে দেখতে পারি কিন্তু আমাদের দৃষ্টি অগোচরে রয়েছে দূরবর্তী আসমান। দিনের বেলায় যেমন সূর্যের আলোয় সবকিছু আলোকিত হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয় ঠিক তেমনি আল্লাহ রাতের আসমানকে উজ্জ্বল তারকা দ্বারা সুশোভিত করেছেন যার সৌন্দর্য ও দীপ্তময়তা আমাদের চোখে বিস্ময় হয়ে ধরা দেয়।

আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন পাখি যা আকাশে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে বেড়ায়। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন পাখিদের উড়ে বেড়ানোর সক্ষমতা দান করেছেন। পাখিদের শরীরকে করেছেন পালকময় ও হাড়গুলোকে করেছেন ফাঁপা প্রকৃতির যার ফলে এরা সহজেই উড়ে বেড়াতে পারে।

আল্লাহ মানুষকে উত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন দান করেছেন শ্রবণশক্তি দৃষ্টিশক্তি ও বিবেক বুদ্ধি। আমরা আল্লাহর দেওয়া দৃষ্টি শক্তির ফলে এই সুন্দর পৃথিবীর সবকিছু দৃষ্টিগোচর করতে পারি। শ্রবনশক্তি ব্যবহার করে আমরা অন্যের কথা শুনতে ও বুঝতে পারি। আর সর্বোপরি বিবেক বুদ্ধি যা মানুষকে অন্যান্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। এই বিবেকবুদ্ধি প্রয়োগ করে একজন মানুষ সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বুঝতে পারে এবং অন্ধ অনুকরণ না করে সত্যের অনুসন্ধান করতে পারে।
আমরা যে জমিনে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছি তা আল্লাহ আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন। ‘তিনি তো সেই মহান সত্তা যিনি ভূপৃষ্ঠকে তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছ তোমরা এর বুকে চলাফেরা করো না আল্লাহর দেয়া রিজিক খাও’ (মূলক:১৫) এবং এই জমিনেই রয়েছে আল্লাহর দেওয়া নিয়মাতের ভান্ডার যা আমরা অন্বেষণ করে বেড়ায়ই। আল্লাহ বলেন-‘এরপর তিনি জমিনকে বিছিয়েছেন তার মধ্য থেকে তার পানি ও উদ্ভিদের করেছেন’ (নাজিয়ার:৩০-৩১)। বহমান পানির স্রোত ধারা যা আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নিয়ামত।

আল্লাহ ভীরুদের শুভ পরিণাম:
এই দুনিয়াতে আল্লাহ আমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেননি। তিনি মানুষ ও জিন সৃষ্টি করেছেন শুধু তার ইবাদত এর জন্য। তবে আমরা পার্থিব দুনিয়ার ধন-দৌলতের ও স্বাস্থ্যের মোহে পড়ে বেমালুম ভুলে যাই আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য। সূরা তাকাসুরে আল্লাহ বলেছেন- ‘বেশি বেশি এবং একে অপরের থেকে বেশি দুনিয়ার স্বার্থ লাভ করার মোহ আমাদের গাফিলতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে’ (তাকাসুর:১)। দুনিয়ার এই সংক্ষিপ্ত জীবনে আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন পরীক্ষা করে দেখবেন কে কর্মে উত্তম। সূরা মূলকে আল্লাহ ঘোষনা দিয়েছেন-‘কাজের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে কে উত্তম তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন’ (মূলক:২)। অর্থাৎ জীবন হলো পরীক্ষার সময় ও অবকাশ মাত্র আর মৃত্যুর অর্থ হল পরীক্ষার সময় ফুরিয়ে এসেছে। এবং যারা আল্লাহ ভীরু ও রবকে না দেখে ভয় করে তারাই সফলকাম হয় অর্থাৎ যারা যাবতীয় খারাপ কাজকর্ম শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে করা থেকে বিরত থাকে। মূলকেও আমরা দেখতে পাই আল্লাহ বলেছেন- ‘যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে নিশ্চয়ই তার লাভ করবে ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কার’ (মূলক-১২)

কুফরের ভয়াবহ পরিণাম:
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন কুরআনের অনেক সূরায় কুফরের, আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এবং আমাদের পূর্বে যে সকল জাতি অবাধ্যতায় লিপ্ত ছিলো তাদের ধ্বংস ও পরিণামের উল্লেখ করেছেন। সূরা মূলকে আল্লাহ বলেছেন-‘ যেসব লোক তাদের রবকে অস্বীকার করেছে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি সেটা অত্যন্ত খারাপ জায়গা'(মূলক-৬)। এবং অস্বীকার কারীরা তাদের পরিণতি সম্পর্কে নিজেরাই স্বীকারোক্তি দিবে যে তাদের কাছে সাবধানকারী আসার পরেও তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং আল্লাহর দ্বীনকে অস্বীকার করেছে। আর যখনি অস্বীকারীদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে জাহান্নাম অত্যধিক ফেটে পড়ার উপক্রম হবে এবং তার ভয়ানক গর্জনের শব্দ শুনতে পাবে এবং তা টগবগ করে ফুটতে থাকবে। এইসময় জাহান্নামীরা আফসোস করে বলবে যদি তারা বিবেক বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করতো তাহলে আজ তাদের শাস্তি পেতে হতো না।

সুতরাং, সূরা মূলক থেকে আমরা আল্লাহর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা তাঁর সকল সৃষ্টির পরিচয় যা তিনি মানুষকে দান করেছেন নিয়ামত স্বরূপ এবং সেই সাথে যারা এসকল সৃষ্টি সম্পর্কে বেপরোয়া ভাব দেখায় ও যারা অস্বীকার কারী তাদের পরিণতি ও আল্লাহ ভীরুদের পুরস্কার সম্পর্কে জানতে পারি।

প্রবন্ধটি ‘দাওয়াতুল হক’ ফেসবুক পেইজ কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় ১ম স্থান অধিকার করে।

লেখিকঃ নরিন জাহান শম্পা।
মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 5
    Shares