রাহমানিয়া দখল-পুনর্দখল: হাকীকত কী?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৬, জুলাই, ২০২১, শুক্রবার
<strong>রাহমানিয়া দখল-পুনর্দখল: হাকীকত কী?</strong>

কলমেঃ মুফতী আব্দুল মুমিনঃ

পূর্বকথন:
রাহমানিয়া কবে কী কারণে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এসব বিষয়ে দেখলাম ইতিমধ্যে অনেকে লিখেছেন। তাই সেদিকে গিয়ে আলোচনা দীর্ঘ করতে চাচ্ছি না। যেখান থেকে সমস্যার শুরু সেখান থেকেই আলোচনা শুরু করছি। আশা করি, এই আলোচনার পর বিষয়টা অনেকটাই খুলাসা হবে ইনশাআল্লাহ।

সমস্যা যেখানে শুরু:
৯০ দশকের শেষের দিকে রাহমানিয়া সমস্যার বাহ্যিক একটা কারণ সামনে আনা হয়েছিল। আর সেটা হলো শাইখুল হাদীসের রাজনীতিমুখিতা। মূলত শাইখুল হাদীসের রাজনীতি নিয়ে কোন সমস্যা ছিল না, সমস্যা সামনে আনা হলো ছাত্রদেরকে রাজনীতিতে জড়ানো নিয়ে। অভিযোগ হলো, শাইখুল হাদীস ছাত্রদেরকে রাজনীতিতে জড়াচ্ছেন, এতে ছাত্রদের পড়ালেখায় ব্যঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। পড়ালেখার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। কাজেই এই কাজটা বন্ধ করতে হবে। মূলত ছাত্রদেরকে রাজনীতিতে জড়ানোকে কেন্দ্র করেই রাহমানিয়া সমস্যার সূচনা হয়।

রাহমানিয়া কতটা রাজনীতিমুখী ছিল এবং বর্তমানে আছে?

আসলে রাহমানিয়া কতটা রাজনীতিমূখী ছিল এটা একটা বড় প্রশ্ন। রাহমানিয়ার ৩৫ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায়, ৯০ এর দশকে মূলত রাজনীতির সবচে বড় দুটি ইস্যু ছিল বাবরী মসজিদ আন্দোলন ও তসলিমা নাসরিন ইস্যু। এই দুটি ইস্যুতেই শাইখুল হাদীস ছিলেন প্রধান নেতৃত্বদানকারী। তাকে কেন্দ্র করেই এই দুটি ইস্যু সারাদেশে বড় আকার ধারণ করে। এই দুই ইস্যুতে বাংলার আনাচে-কানাচে আন্দোলন দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। দুটি ইস্যুই ছিল বড় স্পর্শকাতর। মুসলমানদের ঈমানী চেতনায় আঘাত করার মত বিষয়। এই দুই ইস্যুতে সারাদেশের মত রাহমানিয়ার ছাত্রদেরও ছিল বড় ভূমিকা। এক্ষেত্রে মুফতি মনসুরুল হক সাহেবের ভূমিকাও ভুলবার নয়। রাজপথে তিনি শাইখুল হাদীসের পাশে থেকে কাজ করেছেন। যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন। মুফতি সাহেব হুজুরের ভূমিকা বিষয়ে মাহফুজ ভাইয়ের লেখায় অনেকটাই ফুটে উঠেছে।
এই দুই ইস্যু কি রাজনৈতিক ইস্যু ছিল? মোটেও না। ছিল ঈমানী ইস্যু।

শাইখুল হাদীস মাদরাসায় রাজনীতি চালু করেছেন এই অভিযোগটা যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছিল তার আরো একটি দিক লক্ষ্য করুন। শাইখুল হাদীস যদি আমভাবে বা মাদরাসার অভ্যন্তরে রাজনীতি চালু করতেন তাহলে অবশ্যই প্রথমত শিক্ষকরা তার প্রধান নেতা-কর্মী হতেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাহমানিয়ার কোন একজন শিক্ষক শাইখুল হাদীসের প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কোন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এমন কোন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। আর ২০০০ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত শুধুমাত্র মাওলানা মাহফুজুল হক ও মাওলানা মামুনুল হক সাহেব ছাড়া বর্তমানে নিয়োগপ্রাপ্ত অন্যকোন শিক্ষক খেলাফত মজলিসের সক্রিয় দায়িত্বে আছে এমন প্রমাণও কেউ দিতে পারবে না। কাজেই এই অভিযোগ ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

এবার আসি ছাত্র রাজনীতি বিষয়ে। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত আছি রাহমানিয়ার ছাত্র ছিলাম। তার মানে হলো, অখণ্ড রাহমানিয়াতেও ছিলাম এবং ২০০০ সালের পর সাত মসজিদেও ছিলাম এবং মূল সমস্যার সময়টায় এবং তার আগে-পরে স্বশরীরে উপস্থিত ছিলাম। এই সময়টাতে কখনো শুনিও নাই এবং দেখিও নাই যে, প্রকাশ্যে রাহমানিয়ায় ছাত্র রাজনীতি চালু ছিল। অখণ্ড রাহমানিয়াতেও ছিল না, ২০০০ সালের পরবর্তীতে মাওলানা মাহফুজ সাহেবের আমলেও ছিল না। তবে গোপনে ছাত্ররা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল এটাকে অস্বীকার করা যাবে না। গোপনে ছাত্রদের বিভিন্ন তৎপরতার সাথে সম্পৃক্ততার দায়-দায়িত্ব কখনো কোন প্রতিষ্ঠান নেবে না। এখনও যদি খোঁজ নেওয়া হয় তবে হয়ত এমনও বেরিয়ে আসতে পারে যে, মুফতি সাহেবের জামিয়াতুল আবরারেও গোপনে ছাত্ররা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত, যাত্রাবাড়িতে আমার জানামতে এখনো অসংখ্য ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত, বসুন্ধরা মাদরাসার অসংখ্য ছাত্র গোপনে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তাহলে এটাকে এতা বড় করা কেন হলো? এর পেছনে অবশ্যই কোন উদ্দেশ্য ছিল।

তাছাড়া রাহমানিয়ায় শাইখুল হাদীস যদি ছাত্রদেরকে প্রকাশ্য রাজনীতির সাথে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করতেন তবে কেন তখন শুধুমাত্র ছাত্র মজলিস করার কারণে ‘সময়ের সেরা’ ছাত্র মাওলানা মামুনুল হক সাহেবকে বহিষ্কার করার পরও শাইখুল হাদীস বাধা দিলেন না? কারণ একটাই ছিল, রাহমানিয়াকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া। দরস ও তাদরীসের মাহাওল কায়েম রাখা।

আরো বলি, ২০০০ সালের পরেও রাহমানিয়ায় কখনো প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ দেওয়া হয়েছে এমন নজীর নেই। বরং এমন নজীর অসংখ্য আছে, যাদের ব্যাপারে ছাত্র রাজনীতির অভিযোগ উঠেছে এবং যারা কোন পর্যায়ে ছাত্র মজলিসের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদেরকে শাস্তি ও বহিষ্কারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। একথার স্বপক্ষে আমি অসংখ্য প্রমাণ পেশ করতে পারব।

আরো বলি, ১৯৯৯ সালে আমি মুফতি সাহেব হুজুরের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করেছি। আমার দায়িত্ব ছিল, কারা ছাত্র মজলিস করে তাদেরকে চিহ্ণিত করা। আমার মত এমন আরো অনেকেই ছিলো যারা মুফতি সাহেব হুজুরকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছাত্রদের তথ্য সরবরাহ করে থাকত। কিন্তু তিনি তার গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে কতজন ছাত্র সনাক্ত করতে পেরেছিলেন? কতজন শিক্ষককে চিহ্ণিত করতে পেরেছিলেন রাজনীতিক হিসেবে? পারেন নাই। কারণ যা বলা হচ্ছিল বাস্তবে তা ছিল না। কিন্তু এ বিষয়টাকেই কেন সামনে আনা হলো? কারণ ছিল, ছিল বিশেষ এক উদ্দেশ্য। ছিল এক দূরভিসন্ধি।

কি সেই দূরভিসন্ধি? আসছে পরবর্তী পর্বে…

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 7
    Shares