কুরবানীর ইতিহাস, গুরুত্ব, ফজিলত ও তাৎপর্য

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৬, জুলাই, ২০২১, শুক্রবার
<strong>কুরবানীর ইতিহাস, গুরুত্ব, ফজিলত ও তাৎপর্য</strong>

মুফতি ওমর ফারুকঃ সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য যিনি মানব জাতিকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে দিয়েছেন সম্মান ও মর্যাদা। মানুষকে তার আসল মর্যাদায় টিকিয়ে রাখার জন্য দিয়েছেন বিভিন্ন বিধি-বিধান। কুরবানির বিধান এর মধ্যে অন্যতম। যার মাধ্যমে মানুষকে একদিকে যেমন ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে আল্লাহর অনুগত্যের অধীনে থাকার সুযোগ পায়। অন্যদিকে তার মাঝে লুকিয়ে থাকা পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে মানুষ্যত্ববোধের জাগরণের সুযোগ পেয়ে থাকে। ব্যাহত কুরবানি হচ্ছে তার নির্দিষ্ট দিন সমূহে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা। কুবানির রয়েছে শরীয় মর্যাদা ও গুরুত্ব। আবার কুরবানি আমাদের জীবন প্রবাহে এনে দেয় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা শিক্ষা যা জীবনকে আল্লাহর অনুগত্যের অধীনে থেকে নতুন ভাবে ঢেলে গঠন করতে সাহায্য করে। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

১।কুরবানীর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থঃ

আরবী কুরবান শব্দটি ফারসী বা ঊর্দূতে কুরবানী রূপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ নৈকট্য। আর কুরবান শব্দটি কুরবাতুন শব্দ থেকে উৎপন্ন। আরবী কুরবাতুন এবং কুরবান উভয় শব্দের শাব্দিক অর্থ নিকটবর্তী হওয়া, কারো নৈকট্য লাভ করা প্রভৃতি। ইসলামী পরিভাষায় কুরবানী ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহ রাববুল আলামীনের নৈকট্য অর্জন ও তার ইবাদতের জন্য পশু জবেহ করা হয়। (মাজদুদ্দীন ফীরোযাবাদী, আল-ক্বামূসুল মুহীত্ব, পৃ. ১৫৮; মুফরাদাত লি ইমাম রাগিব ৩/২৮৭; তাফসীরে কাশশাফ, ১/৩৩৩; রায়যাবী, ১/২২২।
আরবীতে কুরবানী শব্দটি ব্যবহৃত হয় না। তাই কুরআনে কুরবানীর বদলে কুরবান শব্দটি মোট তিন জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে যেমনঃ১. নং সূরা আল ইমরানের ১৮৩ নাম্বার আয়াত। ২. নং সূরা মায়িদা’র ২৭ নাম্বার আয়াত। এবং ৩. নং সূরা আহক্বাফের ২৮ নাম্বার আয়াত। অনুরূপভাবে হাদীসেও কুরবানী শব্দটি ব্যবহৃত না হয়ে তার পনিবর্তে উযহিয়্যাহ এবং যাহিয়্যাহ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। উযহিয়্যাহ কুরবানীর দিনসমূহে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে জবেহ করার যোগ্য উট, গরু, ছাগল বা ভেড়াকে বলা হয়। এ শব্দটি যুহা শব্দ থেকে গৃহীত যার অর্থ পূর্বাহ্ণ। যেহেতু কুরবানী জরেহ করার উত্তম সময় হলো ১০যিলহজ্জের (ঈদের দিনের) পূর্বাহ্ণকাল, তাই ঐ সামঞ্জস্যের জন্য তাকে উযহিয়্যাহ বলা হয়েছে। এটিকে আবার যাহিয়্যাহ বা আযহা ও বলা হয়। আর আযহাহ এর বহুবচন হলো ‘আযহা’, যার সাথে সম্পর্ক জুড়ে ঈদের নাম হয়েছে ‘ঈদুল আযহা। বলা বাহুল্য, ঈদুযযোহা কথাটি ঠিক নয়।
মূলত ফারসী, হিন্দী, উর্দূ ও বাংলা ভাষায় আরবি কুরবান শব্দটি কুরবানী অর্থে ব্যহৃত হয়। বাংলার মুসলিমরাও কুরবানী শব্দটির সাথে বেশ পরিচিত।
বর্তমানে আমাদের নিকটে কুরবানীর পশুকেই বিশেষভাবে কুরবান বলা হয়।
(তাফসীরে আল-মানার, ৬/৩৪২) পরিশেষে ঐ যবেহকৃত পশুকেই কুরবান বলা হয়, যা লোকেরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পেশ করে থাকে। (তাফসীরে মাযহারী, ২/১৮৮)
ভারতীয় উপমাহাদেশ তথা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে কুরবানী বলতে বোঝায় যিলহজ্জ মাসের ১০ (দশ) থেকে ১২ (বারো) বা ১৩ তের) তারিখ আসর পর্যন্ত আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে উট, গরু, বকরী ও ভেড়া প্রভৃতির মধ্য হতে কোনো এক পশুকে জবেহ করা।

২।বর্তমান কুরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

কোন প্রেক্ষিতে এ কুরবানী শুরু হলো তাঁর সুদীর্ঘ বর্ণনা মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও হাদীসে নববীতে রয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পুত্র ইসমাইল (আ.) যখন একটু বড় হন তখন ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখেন তিনি প্রিয়তম পুত্রকে কুরবানী করছেন। নবীগণের স্বপ্ন ওহী। তাই তিনি স্বপ্নের আলোকে পুত্রকে কুরবানীর প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ইতোমধ্যে তিনি এ বিষয়ে পুত্রকেও জিজ্ঞাসা করেন। পুত্রতো ভবিষ্যতের নবী। সুতরাং তিনি কি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে যেতে পারেন? তিনি নিঃসন্দেহে জানিয়ে দিলেন যে, পিতাকে যে আদেশ দেয়া হয়েছে তিনি যেন তা প্রতিপালন করেন। সাথে সাথে এ নিশ্চয়তাও দিলেন যে, আল্লাহ চাইলে পিতা তাঁকে এক্ষেত্রে ভীত কিংবা বিচলিত পাবেন না বরং ধৈর্যশীলই পাবেন। আল্লাহর নির্দেশমতো ইবরাহীম (আ.) যখন প্রিয়তম পুত্রকে কুরবানী করার জন্য মাটিতে কাত করে শোয়ালেন তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে তা কবূলের সুসংবাদ পেলেন। তখন আল্লাহর নির্দেশে পুত্রের স্থলে একটি দুম্বা কুরবানী করলেন। ইবরাহীম (আ.)-এর প্রতি কুরবানীর এ নির্দেশকে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ‘স্পষ্ট পরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং সে পরীক্ষায় বিজয়ী হবার ফলে পুত্র কুরবানীর মতো বড় বিষয় থেকে তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন। আর এ মহান ত্যাগের স্মৃতিকে পরবর্তীদের মধ্যে আল্লাহ স্থায়ী করে দিয়েছেন কুরবানীর বিধান প্রবর্তনের মাধ্যমে। ফলে আজো মুসলিম জাতি ঈদুল আযহায় পশু কুরবানীর মাধ্যমে সে কুরবানীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি নিজেরাও ত্যাগের নজরানা পেশ করতে সচেষ্ট হয়।

৩।কুরবানীর জন্তু সমহ।

ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ, উট দ্বারা কুরবানী করা জায়িয। এগুলো ছাড়া অন্য কোনো পশু দ্বারা কুরবানী জায়িয নয়। (হিদায়া, ৪র্থ খণ্ড)
ছাগল, ভেড়া, দুম্বা কুরবানীর জন্য এক বছরের হওয়া জরুরী। যদি ছয় মাসের দুম্বা বা ভেড়া এরূপ মোটা তাজা হয় যে, দেখতে এক বছরের মতো মনে হয় তাহলে এ ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়িয। ছাগল যত মোটা তাজাই হোক না কেন এর জন্য এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরী। এক বছর থেকে একদিন কম বয়সী হলেও এর দ্বারা কুরবানী করা জায়িয হবে না। (শামী, ৫ম খণ্ড)
গরু ও মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর হওয়া আবশ্যক। এর চেয়ে একদিন কম বয়সী হলেও কুরবানী সহীহ হবে না। (শামী, ৫ম খণ্ড)
কুরবানী আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়। তাই কুরবানীদাতার উচিত দোষমুক্ত ও মোটাতাজা পশু কুরবানী করা।

৪।কুরবানীর বিধান বা হুকুমঃ

কুরবানী বিধেয় হওয়ার ব্যাপারে সকল মুসলিম একমত। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। ( মুগনী ১৩/৩৬০ ফতহুল বারী ১০/৩) তবে কুরবানীর হুকুম কি? ওয়জিব না সুন্নাত ? এ বিষয়ে ইমাম ও ফকীহদের মাঝে দুই-টি
মত রয়েছে।
প্রথমত মত: কুরবানী ওয়াজিব। ইমাম আওযায়ী, ইমাম লাইস, ইমাম আবু হানীফা রহ.) প্রমুখের মত এটাই। আর ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদ (রাহ.) থেকে একটি মত বর্ণিত আছে যে তারাও ওয়াজিব বলেছেন।

দ্বিতীয় মত: কুরবানী সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এটা অধিকাংশ উলামাদের মত। এবং ইমাম মালেক ও শাফেয়ী (রাহ.) এর প্রসিদ্ধ মত। কিন্তু এ মতের প্রবক্তারা আবার বলেছেন, ‘সমর্থ্য থাকা অবস্থায় কুরবানী পরিত্যাগ করা মাকরূহ। যদি কোন জনপদের লোকেরা সমর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সম্মিলিতভবে কুরবানী পরিত্যাগ করে তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। কেননা, কুরবানী হলো ইসলামের একটি শিয়ার বা মহান নিদর্শন।(মহাম্মদ বিন উসাইমীন, আহকামুল উযহিয়্যাহ, পৃ. ২৬)

যারা কুরবানী ওয়াজিব বলেন তাদের দলিল:
১। প্রথম দলীলঃ
আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন-
তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কুরবানী কর ।’ [সূরা কাওসার :২]
আর আল্লাহ রাববুল ‘আলামিনের নির্দেশ পালন ওয়াজিব হয়ে থাকে।

2। দ্বিতীয় দলীলঃ
রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন-
যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে না আসে।’ (মুসনাদ আহমাদ, ২/৩২১; হাকেম, ২/৩৮৯; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩১২৩; হাদিসটি হাসান)
যারা কুরবানী পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্কবাণী। তাই কুরবানী ওয়াজিব।
3। তৃতীয় দলীলঃ
রাসূলে কারীম (সা.) কলেছেন-
হে মানব সকল! প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব হলো প্রতি বছর কুরবানী দেয়া। (মুসনাদ আহমাদ, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩১২৫; হাদিসটি হাসান)

যারা কুরবানী সুন্নাত বলেন তাদের দলিল:
১।দলীল
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

তোমাদের মাঝে যে কুরবানী করতে চায়,যিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কুরবানী সম্পন্ন করার আগে তার কোন চুল ও নাখ না কাটে।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৭৭)।
এ হাদিসে রাসূল (সা.)বলেছেন যে কুরবানী করতে চায়’ কথা দ্বারা বুঝা যায় এটা ওয়াজিব নয়।বরং সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।

৫।কুরবানীর গুরুত্বঃ
কুরবানি আল্লাহর একটি বিধান। আল্লাহ তায়াল ইরশাদ করেন তোমার প্রতি পলকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানি কর। (সুরা আল কাউসার-২) তাফসীরে হুকুল মাআনির ভাষ্যমতে কতিপয় ইমাম ঐ আয়াত দ্বারা কুরবানির ওয়াজিব হওয়াকে প্রমান করেছেন। আল্লাহর নির্দেশ পালন মূলত ওয়াজিব তথা ফরজ। তাই সামর্থ্যবান সকল মুসলমানদের ওপর কুরবানি করা আবশ্যক। হাদিসে হযরত যায়েদ ইবনে আরকান (রা:) হতে বর্ণিত হয়েছে সাহাবাদের কেউ কেউ রাসুল (স:) কে জিজ্ঞাসা করলাম হে রাসুল (স:) পশমের ব্যাপারে কি হবে? তিনি বললেন প্রতি পশমের বদলে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে। (ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, হাকিম) রাসুল (স:) বলেছেন যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করেনা সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে’’ (ইবনে মাজাহ ৩১২৩, হাদিসটি হাসান)

৬।কুরবানীর ফযীলত:
১. কুরবানী দাতা নবী ইব্রাহীম (আ.) ও মুহাম্মদ (সা.)- এর আদর্শ বাস্তবায়ন করে থাকেন।
২. পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কুরবানী দাতা আল্লাহ রাববুল ‘আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :-
‘আল্লাহর নিকট পৌছায় না উহার গোশত এবং রক্ত, বরং পৌছায় তোমাদের তাক্বওয়া। এ ভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়নদেরকে।’ [সূরা হজ্জ্ব:৩৭]।

৭।কুরবানী বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলি:

কুরবানী করা আল্লাহর এক ইবাদত। আর কিতাব ও সুন্নাহ দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, কোন নেক আমল সালেহ বা ভাল হয় না, কিংবা গৃহীত ও কৈট্যদানকারী হয় না, যতক্ষণ না তাতে প্রাথমিকভাবে ( যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত) দুটি শর্ত পূরণ হয়েছে:

প্রথমত: ইখলাস অর্থাৎ তা যেন খাটি আল্লাহরই উদ্দেশ্যে হয়। তা না হলে তা আল্লাহর নিকটে কবূল হবে না। যেমন কাবীলের নিকট থেকে কুরবানী কবুল করা হয়নি এবং তার কারণ স্বরূপ হাবীল বলেছিলেন

অর্থাৎ আল্লাহ তো মুত্তাক্বী (পরহেযগার ও সংযমী)দের কুরবানীই কবূল করে থাকেন। (সূরা মায়িদা (৫):২৭)

এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ আরো বলেছেন

অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ওগুলোর (কুরবানীর পশুর) না গোশত পৌঁছে আর না রক্ত পৌঁছে বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি ওগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পার এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, কাজেই সৎকর্মশীলদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও। (সূরা হাজ্জ ২২ঃ ৩৭)

দ্বিতীয়ত : তা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত বিধি-বিধান অনুযায়ী হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।(সূরা কাহফ:১১০) ।
সুতরাং যারা কেবল বেশী করে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানী দেয় অথবা লোক সমাজে নাম কুড়াবার উদ্দেশ্যে মোটা-তাজা অতিরিক্ত মূল্যের পশু ক্রয় করে এবং তা প্রদর্শন ও প্রচার করে থাকে তাদের কুরবানী যে ইবাদত নয়- তা বলাই বাহুল্য।
গোশত খাওয়ার উদ্দ্যেশ্যে কুরবানি দিলে শুধু গোশত খাওয়াই হবে, এর দ্বারা কোন সাওয়াব হবে না। তাই অবশ্যই নিয়াত পরিশুদ্ধ করতে হবে।

৮। কুরবানীর কতিপয় মৌলিক শিক্ষা:

কুরবানীতে মুমিনের জন্য অসংখ্য শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে (ক)বিশ্বব্যাপী তাওহীদ প্রতিষ্ঠা: মহান আল্লাহর তাওহীদ বা একত্ববাদ বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করা কুরবানীর অন্যতম শিক্ষা। কারণ, একমাত্র বিশ্বজাহানের মালিক মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে, তার নামেই পশু কুরবানী দেয়া হয়। জগতের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা যেখানে তাদের দেব-দেবির নামে কুরবানী করে, সেখানে মুসলিম সমাজ কোরবানী দেয় একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে।

(খ)আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমার্পণ: কুরবানীর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমার্পণ। আল্লাহর সকল আদেশের সামনে বিনা প্রশ্নে মাথানত করে দেয়াই হল পূর্ণ আত্মসমার্পণের সমুজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। ঈদুল আযহার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আমরা হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তদ্বীয় পুত্র ঈসমাইল (আ.)এর এরূপ পুর্ণ আত্মসমার্পণের চিত্রই পবিত্র কুরআনুল কারীমে দেখতে পাই।
(গ) ইখলাস বা একনিষ্ঠতা: সকল কাজে ইখলাস বা একনিষ্ঠতাই ইসলামের মহান শিক্ষা। ইখলাস ছাড়া পরকালীন কোনো কাজই আল্লাহতায়ালা কবুল করেন না। আন্তরিকতা ও মহব্বতবর্জিত ইবাদত প্রাণহীন কাঠামো মাত্র। তাই কুরবানীও একমাত্র আল্লাহ তায়ালার রেজাবন্দী হাসিলের জন্য দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ তায়ালার আদেশ, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার নিকট কুরবানীর পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না। তার নিকট তোমাদের তাকওয়া (ইখলাস) পৌঁছে’। (সূরা হাজ্জ্ব-৩৭)। ইখলাসপূর্ণ কুরবানী হওয়ার কারণেই আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম (আ.) এর কুরবানী কবুল করে নিয়েছিলেন।

(ঘ) তাকওয়াভিত্তিক জীবন-যাপন: কুরবানীর সুমহান দীক্ষা তাকওয়াভিত্তিক জীবন-যাপন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনই মুমিনের প্রকৃত সফলতা। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা তার আমলকেই কবুল করেন, যার আমলে তাকওয়া বা খোদাভীতির সন্নিবেশন ঘটেছে। আদমপুত্র হাবিলের কুরবানী আল্লাহতায়ালা কবুল করেছিলেন তাকওয়ার প্রভাবের কারণেই।

(ঙ) দরিদ্র ও অনাথের সুখে-দুঃখে অংশীদার: কুরবানীর অন্যতম শিক্ষা দরিদ্র ও অনাথের সুখ-দুঃখে ভাগীদার হওয়া। ঈদুল আযহার নামাজে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের সহাবস্থানের পাশাপাশি আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র-অনাথের মাঝে কুরবানীর গোশত বণ্টন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, আমাদের সম্পদে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের অধিকার রয়েছে।

কুরবানী মুসলমানদের শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পরিশুদ্ধ জীবন গঠনের নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনও বটে। এর মাধ্যমে মুসলমান তাওহীদী আদর্শে উজ্জীবীত হয়ে ইখলাস, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমার্পণের অপূর্ব নজির স্থাপন করতে পারেন।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকল মুসলমানদের কে সঠিক ভাবে কুরবানী করার তাওফিক দান করুক।

লেখকঃ মাওলানা মুফতি ওমর ফারুক।
তরুণ ইসলামি লেখক, গবেষক, ও সাংবাদিক।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন