কুরবানীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৭, জুলাই, ২০২১, শনিবার
<strong>কুরবানীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।</strong>

মুফতি ওমর ফারুক

সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য যিনি মানব জাতিকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে দিয়েছেন সম্মান ও মর্যাদা। মানুষকে তার আসল মর্যাদায় টিকিয়ে রাখার জন্য দিয়েছেন বিভিন্ন বিধি-বিধান। কুরবানির বিধান এর মধ্যে অন্যতম। যার মাধ্যমে মানুষকে একদিকে যেমন ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে আল্লাহর অনুগত্যের অধীনে থাকার সুযোগ পায়। অন্যদিকে তার মাঝে লুকিয়ে থাকা পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে মানুষ্যত্ববোধের জাগরণের সুযোগ পেয়ে থাকে। ব্যাহত কুরবানি হচ্ছে তার নির্দিষ্ট দিন সমূহে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা। কুবানির রয়েছে শরীয় মর্যাদা ও গুরুত্ব। আবার কুরবানি আমাদের জীবন প্রবাহে এনে দেয় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা শিক্ষা যা জীবনকে আল্লাহর অনুগত্যের অধীনে থেকে নতুন ভাবে ঢেলে গঠন করতে সাহায্য করে। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

১।কুরবানীর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থঃ

আরবী কুরবান শব্দটি ফারসী বা ঊর্দূতে কুরবানী রূপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ নৈকট্য। আর কুরবান শব্দটি কুরবাতুন শব্দ থেকে উৎপন্ন। আরবী কুরবাতুন এবং কুরবান উভয় শব্দের শাব্দিক অর্থ নিকটবর্তী হওয়া, কারো নৈকট্য লাভ করা প্রভৃতি। ইসলামী পরিভাষায় কুরবানী ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহ রাববুল আলামীনের নৈকট্য অর্জন ও তার ইবাদতের জন্য পশু জবেহ করা হয়। (মাজদুদ্দীন ফীরোযাবাদী, আল-ক্বামূসুল মুহীত্ব, পৃ. ১৫৮; মুফরাদাত লি ইমাম রাগিব ৩/২৮৭; তাফসীরে কাশশাফ, ১/৩৩৩; রায়যাবী, ১/২২২।
আরবীতে কুরবানী শব্দটি ব্যবহৃত হয় না। তাই কুরআনে কুরবানীর বদলে কুরবান শব্দটি মোট তিন জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে যেমনঃ১. নং সূরা আল ইমরানের ১৮৩ নাম্বার আয়াত। ২. নং সূরা মায়িদা’র ২৭ নাম্বার আয়াত। এবং ৩. নং সূরা আহক্বাফের ২৮ নাম্বার আয়াত। অনুরূপভাবে হাদীসেও কুরবানী শব্দটি ব্যবহৃত না হয়ে তার পনিবর্তে উযহিয়্যাহ এবং যাহিয়্যাহ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। উযহিয়্যাহ কুরবানীর দিনসমূহে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে জবেহ করার যোগ্য উট, গরু, ছাগল বা ভেড়াকে বলা হয়। এ শব্দটি যুহা শব্দ থেকে গৃহীত যার অর্থ পূর্বাহ্ণ। যেহেতু কুরবানী জরেহ করার উত্তম সময় হলো ১০যিলহজ্জের (ঈদের দিনের) পূর্বাহ্ণকাল, তাই ঐ সামঞ্জস্যের জন্য তাকে উযহিয়্যাহ বলা হয়েছে। এটিকে আবার যাহিয়্যাহ বা আযহা ও বলা হয়। আর আযহাহ এর বহুবচন হলো ‘আযহা’, যার সাথে সম্পর্ক জুড়ে ঈদের নাম হয়েছে ‘ঈদুল আযহা। বলা বাহুল্য, ঈদুযযোহা কথাটি ঠিক নয়।
মূলত ফারসী, হিন্দী, উর্দূ ও বাংলা ভাষায় আরবি কুরবান শব্দটি কুরবানী অর্থে ব্যহৃত হয়। বাংলার মুসলিমরাও কুরবানী শব্দটির সাথে বেশ পরিচিত।
বর্তমানে আমাদের নিকটে কুরবানীর পশুকেই বিশেষভাবে কুরবান বলা হয়।
(তাফসীরে আল-মানার, ৬/৩৪২) পরিশেষে ঐ যবেহকৃত পশুকেই কুরবান বলা হয়, যা লোকেরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পেশ করে থাকে। (তাফসীরে মাযহারী, ২/১৮৮)
ভারতীয় উপমাহাদেশ তথা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে কুরবানী বলতে বোঝায় যিলহজ্জ মাসের ১০ (দশ) থেকে ১২ (বারো) বা ১৩ তের) তারিখ আসর পর্যন্ত আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে উট, গরু, বকরী ও ভেড়া প্রভৃতির মধ্য হতে কোনো এক পশুকে জবেহ করা।

২।বর্তমান কুরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

কোন প্রেক্ষিতে এ কুরবানী শুরু হলো তাঁর সুদীর্ঘ বর্ণনা মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও হাদীসে নববীতে রয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পুত্র ইসমাইল (আ.) যখন একটু বড় হন তখন ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখেন তিনি প্রিয়তম পুত্রকে কুরবানী করছেন। নবীগণের স্বপ্ন ওহী। তাই তিনি স্বপ্নের আলোকে পুত্রকে কুরবানীর প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ইতোমধ্যে তিনি এ বিষয়ে পুত্রকেও জিজ্ঞাসা করেন। পুত্রতো ভবিষ্যতের নবী। সুতরাং তিনি কি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে যেতে পারেন? তিনি নিঃসন্দেহে জানিয়ে দিলেন যে, পিতাকে যে আদেশ দেয়া হয়েছে তিনি যেন তা প্রতিপালন করেন। সাথে সাথে এ নিশ্চয়তাও দিলেন যে, আল্লাহ চাইলে পিতা তাঁকে এক্ষেত্রে ভীত কিংবা বিচলিত পাবেন না বরং ধৈর্যশীলই পাবেন। আল্লাহর নির্দেশমতো ইবরাহীম (আ.) যখন প্রিয়তম পুত্রকে কুরবানী করার জন্য মাটিতে কাত করে শোয়ালেন তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে তা কবূলের সুসংবাদ পেলেন। তখন আল্লাহর নির্দেশে পুত্রের স্থলে একটি দুম্বা কুরবানী করলেন। ইবরাহীম (আ.)-এর প্রতি কুরবানীর এ নির্দেশকে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ‘স্পষ্ট পরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং সে পরীক্ষায় বিজয়ী হবার ফলে পুত্র কুরবানীর মতো বড় বিষয় থেকে তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন। আর এ মহান ত্যাগের স্মৃতিকে পরবর্তীদের মধ্যে আল্লাহ স্থায়ী করে দিয়েছেন কুরবানীর বিধান প্রবর্তনের মাধ্যমে। ফলে আজো মুসলিম জাতি ঈদুল আযহায় পশু কুরবানীর মাধ্যমে সে কুরবানীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি নিজেরাও ত্যাগের নজরানা পেশ করতে সচেষ্ট হয়।

লেখকঃ
মাওলানা মুফতি ওমর ফারুক
তরুন ইসলামি লেখক গবেষক ও সাংবাদিক।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন