ঘুরে এলাম হাওর-বাওর

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৭, জুলাই, ২০২১, শনিবার
<strong>ঘুরে এলাম হাওর-বাওর</strong>

কাদির চৌধুরী বাবুলঃ বাহুবল প্রেসক্লাবের উদ্যোগে জলাবন ভ্রমণের আয়োজন চলছিল ক’দিন ধরে। দিনক্ষণ ঠিক হলো। কেবল অপেক্ষার পালা।
সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো, দিনটি ছিলো শুক্রবার। মিনিবাসযোগে সকাল ১০ টায় হবিগঞ্জ, কালারডোবায় পৌছলাম সবাই। সুসজ্জিত বিশাল নৌকাটি ঘাটে বাঁধা। হাওরের বুকে চলাৎ চলাৎ ঢেউ ভেঙে কিছুক্ষণের মধ্যই ভাসবে নৌকা। যথারীতি প্যাকেটজাত খাবার নৌকায় পৌঁছে গেলো।
যোগ দিলেন — লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিক্ষক বন্ধুরা। যোগ দিলো প্রেরণা শিল্প গোষ্ঠীসহ আরও অনেকই। ফটোসেশনের কাজ শেষ না হতেই নৌকা থেকে ভেসে এলো সুরের মু্র্চনা —
‘মাঝি নাও ছাইরা দে
ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে…….’

নৌকা ভাসলো বিস্তির্ণ হাওরে। শাপলা শালুক পদ্মপাতার দল মারিয়ে আমাদের নৌকা ভাসছে হাওড়ের বুক চিরে। চলাৎ চলাৎ ঢেউ তোলে ইঞ্জিন বোটের ভটভট শব্দে হাওরে পাখিদের ডানা জাপটে উড়োউড়ি আর পনকৌড়ির টুপর টুপর ডোব দেওয়ার দৃশ্যটি দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছি গভীর হাওড়ের দিকে। ক্ষণে ক্ষণে শিল্পী বন্ধুদের ভাটিয়ালী সুরে ভেসে আসছে নানা সুর।
ভাটিপল্লীর কন্যাদের হাওর স্নানের দৃশ্য দেখে মনে পড়ে গেল উকীল মুন্সীর সেই গান—
আমার কাংখের কলসী গিয়াছে ভাসি
মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়া——-
হাওর পাড়ার বধুদের জীবন যেন হাওরের স্বচ্ছজলে পানকৌড়ির মতোই একাকার। ঘোমটা পরে ঘাটে স্নান করতে আসা বধুটি আড় চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে উজান দেশের মানুষের হাওর বিলাস।
বিথঙ্গলের আখড়ার দিকে-
প্রচণ্ড রোদ। তবে মিষ্টি বাতাসের তোড়ে রোদের কোনো প্রভাব নেই। পথে যেতে যেতে স্বচ্ছ পানিতে দৃশ্যমান পানির জগৎ —
আর বুক পানিতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা হিজলগাছ-
কী অপরূপ দৃশ্য!
ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে এগিয়ে চললো নৌকা।
মাঝে মধ্যে দ্বীপেরমতো গ্রাম, কোথাও এক একটা বাড়ি নিয়েই দ্বীপবাড়ি জেগে আছে হাওরসম ডুবো ক্ষেতের ওপরে। একটা বিশাল হিজলগাছ ডালপালা ছড়িয়ে যেনো জেঁকে বসে আছে অর্ধেকটা শরীর পানিতে ডুবিয়ে।
হাওর বিলাসী এক বন্ধুর কন্ঠে ভেসে এলো ভাটি বাংলার গানের পাখি বাউল অাব্দুল করিমের গান——-
‘ বন্ধে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে—-
দিওয়ানা বানাইছে—-
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে——

নৌকার ছইয়ের উপর জমে উঠেছে গানের আসর। আসরে যোগ দিলেন, প্রেরণা শিল্পগোষ্ঠীর হাফিজ মুসাদ্দেক আলী মুসা, কবি কাজী শামিম আহমেদ আর আমি—-
গাইলাম –
কোন মেস্তুরী নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়—–
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূর পঙ্খি নায়—
গান আর কবিতা আবৃত্তি —
মাঝেমধ্যে মুসার কন্ঠে হামদ ও নাত —গেয়ে নাচিয়ে তোলেন হাওরের ঢেউ।
কেউ কেউ ফেসবুকে ব্যস্ত। কেউ কেউ চমৎকার দৃশ্য ধারণ করে আপলোড দিচ্ছেন। স্ট্যোটাস লিখছেন চমৎকার চমৎকার। দেশ বিদেশে কর্মরত অনেক ফেসবুক বন্ধু আমাদের স্ট্যাটাসে লাইক কমেন্ট দিয়ে আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
এক ফাঁকে আসলেন সিদ্দকুর রহমান মাসুম। হাতে রাফেল ড্র এর টিকেট। লোভনীয় অফার দিয়ে সমস্ত টিকেট বিক্রি করে নিলেন। চমৎকার চমৎকার ফেরিওয়ালার লেকচার শুনছিলাম সাংবাদিক আনোয়ার সজলের মুখ থেকে।
এইতো বাঁয়ে পৈলারকান্দি আর ডানে বিথঙ্গলের মাঝ দিয়ে আসা ঝিরি-ঝিরি বাতাস যেন প্রশান্তির। মাঝে থৈথৈ পানিতে দুই ভাগ হয়ে আছে বিথঙ্গল গ্রাম। শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে একটাই গ্রাম হবে দুই দ্বীপ মিলে। প্রায় আড়াই ঘন্টা পর জগদানন্দ স্কুল ঘাটে ভিড়লো নৌকা। ঘাটে এসে নেমে পড়লাম সবাই।
ঘাট থেকে আখড়ায় যেতে পায়ে হেঁটে ২ থেকে ৩ মিনিটের পথ। অবশ্য ঘাট থেকে নেমেই আগে পড়বে একটা জমজমাট বাজার। বাজার পেরিয়ে আখড়ার প্রধান ফটকের সামন বিরাট পুকুর। পুকুর পাড়ে বিথঙ্গল আখড়া। বিশাল চৌকোনা চত্বর ঘিরে রেখেছে মুঘল কাঠামো। তাতে সারি সারি ঘর। সব মিলিয়ে ১২০টি। মাঝে উন্মুক্ত চত্বর। পুরনো অনেক ঘরের দেয়াল-ছাদ ধসে গেছে।
এই আখড়া বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান। এ আখড়ার প্রতিষ্ঠাতা রামকৃষ্ণ গোস্বামী। হবিগঞ্জের তৎকালীন রিচি পরগনার অধিবাসী রামকৃষ্ণ গোস্বামী। (উইকিপিডিয়া) উপমহাদেশের বিভিন্ন তীর্থস্হান সফর শেষে ষোলো শতকে এখানে ঘাঁটি গাড়েন রামকৃষ্ণ গোস্বামী। তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ত্রিপুরার রাজা উচ্চবানন্দ মাণিক্য বাহাদুর প্রাচীন নির্মাণ কৌশল সমৃদ্ধ দু’টি ভবন নির্মাণ করে দেন। এ আখড়ায় সস্ত্রীক এসে প্রায়ই অবস্থান করতেন তিঁনি। পরে রামকৃষ্ণ গোম্বামীর সমাধিস্থলে আধুনিক নির্মাণ কৌশল সমৃদ্ধ ভবন তৈরি করা হয়।
চালা আকৃতির ছাদের সেই ভবনের একপাশে রাখা শ্বেত পাথরের চৌকিটির ওজন ২৫ মণ। আরো আছে পিতলের সিংহাসন, নকশা খচিত প্রাচীন রথ এবং রূপার পাখি ও সোনার মুকুট।
আখড়ার পাশেই বাড়ি কীর্ত্তনগায়ক সুকুমার দাস মোহন্ত গোস্বামীর। তিনি জানান, রামকৃষ্ণ গোস্বামীর অনুসারীরা জগমোহিনী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। সারা দেশে তিন থেকে সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ আছে এ সম্প্রদায়ের। নির্বাণ সঙ্গীত নামে তাদের এক স্বতন্ত্র সঙ্গীত ধারাও আছে।
কার্তিক মাসের শেষদিন ভোলা সংক্রান্তি উপলক্ষে কীর্ত্তন হয় এখানে। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোল পূর্ণিমার পাঁচ দিন পর উদযাপন হয় পঞ্চম দোল উৎসব। এছাড়া চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে হয় পূণ্যস্থান। স্নানঘাটে বসে বারুনী মেলা। রথযাত্রা হয় আষাঢ়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে।
আখড়া ঘুরে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আমরা। গরমে কিছুটা অতিষ্ঠ। হাওর ভ্রমণের স্বাদ নিতে পানিতে না নামলে কি হয়?
অনেকেই পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে লুঙ্গি গামছা সাথে করে এনেছি। কেউ কেউ বললেন, আখড়ার ঘাটে স্নান না করে কী যাওয়া যায়! ব্যস্ত বন্ধুদের সময়ের তাড়া থাকলেও আমরা ক’জন স্নান করেই তবে যাব এমন ভাব দেখালে ব্যস্ত বন্ধুরা আমাদের কথায় আসেন।
অনেকই সাঁতার প্রতিযোগিতা করতে আগ্রহী। ব্যাস সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
আনন্দঘন মূহুর্তে বিথঙ্গল আখড়ার পুকুরে সাঁতার প্রতিযোগিতায় অনেকের সাথে আমিও নেমে পড়ি। হাজার দর্শকের উপস্থিতে শুরু হয় সাঁতার প্রতিযোগিতা।
প্রশস্ত আখড়ার পুকুর পাড়ি দিতে কি যে ভয়াবহ স্মৃতি। পানি টানি খেয়ে কোন রকম পাড়ের নাগাল পাই। দু’একজন ছাড়া আর বাকিদের পুকুর পাড়ি দিতে হাবুডুবু খেতে হয়েছিলো।
হাতে সময় নেই। দ্রুত নৌকায় ফিরে দুপুরের খাবার শেষ করি। তারপর যাত্রা করি লক্ষ্মীবাওরের উদ্দেশ্য।
লক্ষ্মী বাওর–
যেতে যেতে চোখে পড়লো খরতি নদীর দক্ষিণে লক্ষ্মী বাওড়। প্রায় ছয়-সাতশত একর ভূমি জুড়ে বিস্তৃর্ণ এই লক্ষ্মী বাওড় পৃথিবীতে এরকম নাকি মাত্র সাতটি বাওড় রয়েছে। কি যে অপরূপ সুন্দর্যের জলাবন। কি নেই সেখানে! কদম, হিজল, বরুণ, জারুল, অর্জুন, দেওকলম বনো জলাগাছের সমারোহ। জলপাখিদের আস্তানা। সাদা বক, কানি বক, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, বালি হাঁস, কত বনোপাখি। শেয়াল, মেছুবাঘ, গুইসাপ, গোখড়া, বনোবিড়াল, বানর, বেজি, ভোদর সকল প্রকার জীব জানুয়ার জলাবনে বাস করে। তিন কিলোমিটার বিস্তৃর্ণ লক্ষ্মী বাওর দূর থেকে নজরে আসছে।
বর্ষায় চারদিক পানি থৈ থৈ করে। শুকনো মৌসুম আসলে পানি কমে যায়। তারপরও বিলে পানি জমাট থাকে। এগুলোতে লোকজন মাছ শিকার করে। হাওড় হলেও এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ। আর এখানের গাছ গাছালিতে রয়েছে পাখির আবাসস্থল।
যদিও পানির মধ্যে বন। এমন বন নিয়ে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট দেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। এ খ্যাতির সাথে মিল খুঁজে পাওয়া এই জলাবন দেখতে দর্শনার্থীরা এখানে আসছেন। কয়েক বছরে তুলনামূলক দিন দিন দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
জলাবন এলাকাবাসীর কাছে এটি খরতির জঙ্গল নামেও পরিচিত। কখন কিভাবে এই জঙ্গল সৃষ্টি হয় তা অনেকের অজানা।
এখানে প্রকৃতির এই বিচিত্র রূপ সত্যিই বিস্ময়কর। বর্ষাকালে চারদিকে হাওরের থৈ থৈ পানির মধ্যে অসংখ্য গাছপালার সবুজ অরণ্য পরিবেশকে এক নান্দনিক রূপ দিয়েছে। দূর থেকে জঙ্গলটিকে দেখে মনে হবে বন যেন পানির উপর ভাসছে। বলতে গেলে এতদিন অনাবিস্কৃতই রয়েছিল জলাবন খ্যাত লক্ষী বাউর।
প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাব্যাপী জঙ্গলের পূর্বে গঙ্গাজল হাওর ও নূরপুর, পশ্চিমে নলাই নদী, উত্তরে খরতি নদী এবং দক্ষিণে লোহাচূড়া নদী ও শোলাটেকা গ্রাম। বর্ষাকালে কয়েক মাস এ বন নিমজ্জিত থাকে। এ সময়ে জলাবন দেখতে নৌকাই ভরসা। শরত্কালে মোটর সাইকেল, ট্রলিসহ হালকা যানবাহন কিংবা হেঁটেই দেখা যায় লক্ষ্মী বাউর জলাবনের নান্দনিক সৈন্দর্য্য। শীতকালে অতিথি পাখির কাকলিতে মুখরিত হয় নির্জন এই জলাবন। কিন্তু সময় যে হাতে অনেক কম। আমাদের গন্তব্যের দিকে ফিরতে হবে। কিন্তু যত দেখছি ভাটিবাংলার রাজধানী ততই দেখার ইচ্ছাটা আরও প্রবল হয়ে উঠছে। ঘড়ির কাটা প্রায় চারটে জানান দিলো।
নৌকা কালারডোবার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। হাওরের পথ বেয়ে বেয়ে নৌকা আমাদের এগিয়ে চলেছে গন্থব্যের দিকে। মুর্শিদী, ভাটিয়ালি গানে গানে হাওরের বুক চিরে নৌকা আমাদের ছুটে চলছে উজান দিকে। হাওরের বুকে রেখে যাচ্ছে সারা দিনের স্মৃতি–
বারী সিদ্দিকীর সুরে গেয়ে উঠলাম—
আমার গায়ে যত দুঃখ সয় —-
বন্ধুওয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয় ——–
নিঠুর বন্ধুরে ——–

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন