রাহমানিয়া দখল পুনর্দখল:হাকীকত কী?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৮, জুলাই, ২০২১, রবিবার
রাহমানিয়া দখল পুনর্দখল:হাকীকত কী?

বিজয়াবাংলা ডেস্ক:
ছাত্রদের মাঝে কতটা উচ্ছাস ছিল; একই সাথে কতটা চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। মুফতি সাহেব হুজুরের কামরা ছিল রাহমানিয়ার মাঝখানের সিড়ির পাশেই। উনার কামরার ঠিক উল্টো দিকে ছিল কাফিয়া জামাতের কামরা। কাফিয়ার এক অবিবেচক ছাত্র মুফতি সাহেব হুজুরের কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে খুশিতে নাকি ঠেলায় জানি না, ঘোষণা দিল- ‘জাআল হাক্ব ওয়াহাকাল বাতিল ইন্নাল বাতিলা কানা যাহুক্বা’। (সত্য সমাগত, মিথ্যা বিতাড়িত; মিথ্যা বিতাড়িত হওয়ারই ছিল।) এই ঘোষণা বা তেলাওয়াতটি শুনে ফেলে মুফতি সাহেব হুজুরের একান্ত খাদেম নাজমুল নামে ইফতার এক ছাত্র। আর যায় কোথায়! ওই সময়কার রাহমানিয়ার ছাত্ররা একটু আন্দাজ করুন, বিষয়টা কতটা ভয়াবহ ছিল। নিশ্চিত বহিষ্কারযোগ্য অপরাধ। মুফতি সাহেবকে বাতিল আখ্যা দেওয়া যেন তেন ব্যাপার নাকি? কিন্তু শাইখের সাথে এমন কাণ্ড ঘটানোর পর ছাত্ররা মানসিকভাবে এমন অবস্থায়ই চলে গিয়েছিল।
যাই হোক, যে রাহমানিয়ায় বহিষ্কার একটা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার এবং পানিভাতের মত এক সহজ কাজ, সেই রাহমানিয়ায় এই অবিবেচক ছাত্রের আর রক্ষে হয় কি করে? বিষয়টা নিয়ে তুলকালাম কাÐ ঘটে যায়। গোটা মাদরাসায় এটা নিয়ে শুরু হয় গুঞ্জন, বহিষ্কারাদেশের ঘোষণাটা কখন আসে সেই অপেক্ষায় থাকে সবাই। এর মধ্যে নেগরান উস্তাদসহ অনেকেই বিষয়টার ভয়াবহতা তুলে ধরে তাকে শাষায়। এমনকি মুমিনপুরী হুজুরের জেরার মুখে কারণ দর্শানোর মত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় ওই গোবেচারাকে। বিষয়টা যদি এখানেই শেষ হতো তাহলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু আমি-আপনি যতটা সহজ মনে করছি বিষয়টা তাদের কাছে এতটা সহজ ও হালকা ছিল না। এদিকে এই গোবেচারার নাওয়া-খাওয়া ও রাতের ঘুম সবই উধাও। বিষয়টা কোন জায়গায় গিয়ে ঠেকবে, বোঝাও যাচ্ছিল না। শেষমেষ এটার জন্য ডাকা হয় মাদরাসা কমিটির মিটিং। মাদরাসা কমিটির মিটিং সচরাচর ডাকা হয় না। অতিগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় হলেই তবে ডাকা হয়। বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পরদিন বাদ ফজর বসে মিটিং। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা যুক্তি-তর্কের পর সেই গোবেচারাকে দু’তলার দফতরে ডাকা হয়। দফতর ভর্তি লোক। চলছে কথার উপর পাল্টা কথা। উচ্চবাচ্য। এরই মাঝে উপস্থিত হয় সেই গোবেচারা। কাফিয়া জামাতের ছাত্র। মুখে নেই দাড়ি-গোঁফ। হালকা-পাতলা গড়ন। তাকে দেখে কমিটির এক সদস্য বলে উঠেন-
-এই ছেলে এই কাজ করেছে? এই ছেলে, তুমি কী পড়? ‘জাআল হাক্ব ওয়াযাহাক্বাল বাতিল’ অর্থ জানো? তোমার বয়স কত? এরকম অনেকগুলো প্রশ্ন একসাথে করলেন ওই কমিটির সদস্য।
-গোবেচারা নীরব।
-আরেকজন প্রশ্ন করল, তুমি ফ্রি খাও না টাকা দিয়ে খাও?
-গোবেচারার উত্তর, ‘স্পেশাল খানা খাই’।
-এবার কমিটির এই সদস্য নীরব।
-আরেক সদস্যের প্রশ্ন- তুমি এমন কাজ কী করে করলে? তোমার ক্লাসের রোল কত?
-গোবেচারার উত্তর- ‘দুই’। এবার এই সদস্যও নীরব।
-সর্বপ্রথম কথা বলা কমিটির ওই সদস্য এবার ধমকের স্বরে বললেন, তুমি তো এখনও বাচ্চা ছেলে, ভাল বুঝ-জ্ঞানও তো মনে হয় এখনো হয় নাই। আমরা চেষ্টা করছি মাদরাসার পরিবেশ ঠিক করতে আর তোমরা পরিবেশ নষ্ট করছ। এক্ষুণি হুজুরদের (মুফতি সাহেব ও মুমিনপুরী) পা ধরে মাফ চাও।
-গোবেচারার হাত তখন দু’জনের পায়ে।
-কমিটির ওই সদস্য আবার বললেন, ‘আর কোনদিন যদি এমন শুনি, ঘাড় ধরে মাদরাসা থেকে বের করে দিব।’ কমিটির সম্মানিত এই সদস্য ছিলেন সাবেক এমপি মুফতি শহীদুল ইসলাম হাফিজাহুল্লাহ।
-গোবেচারা তখন মাথা নিচু করে দফতর থেকে বিদায় নেয়। আর এভাবেই শেষ হয় হক্ব-বাতিল কাণ্ড।

শাইখুল হাদীসের প্রতি অমানবিক আচরণ

পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শাইখুল হাদীসকে শুধুমাত্র সকালে বুখারীর দরস প্রদানের সুযোগ দেয়া হত। আমরা দেখেছি, শাইখুল হাদীস সকালে মাদরাসায় এসে মাদরাসায় উনার জন্য কোন কামরা বরাদ্দ না থাকায় তিনি গাড়িতে বসেই নাস্তা সারতেন। গাড়ি থেকে নেমে এদিক-সেদিক না তাকিয়ে সোজা দাওরায়ে হাদীসের কামরায় যেতেন, সেখান থেকে আবার কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা গাড়িতে। এ দৃশ্য এক দুই দিনের নয়; অনেকদিন আমরা এ দৃশ্য দেখেছি। ছাত্ররা যেন শাইখুল হাদীসের সাথে কোন যোগাযোগ রাখতে না পারে, এজন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন মুফতি সাহেব হুজুর। তিনি বিশেষ গোয়েন্দা লাগিয়ে রাখতেন, কারা শাইখের সাথে বিশেষ যোগাযোগ রাখে সে তথ্য সংগ্রহের জন্য। এরকম অপরাধে কেউ জড়িত হলে তার জন্য ছিল মুফতি সাহেব হুজুরের বিশেষ শাস্তির ব্যবস্থা। এই শাস্তির ভয়ে অনেকেই চুপ থাকলেও ছাত্রদের মাঝে চাপা ক্ষোভ যে তৈরি হচ্ছিল তা তাদের পরস্পর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই বোঝা যাচ্ছিল। শাইখের প্রতি মুফতি সাহেব হুজুরের অমানবিক আচরণ যত বাড়ছিল, ছাত্রদের মাঝে ততই ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল। আর অনীহা তৈরি হচ্ছিল মুফতি সাহেব হুজুরের প্রতি। যা একসময় ছাত্র অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

পরবর্তী পর্বে পড়ুন-
‘স্বপ্রণোদিত ছাত্র অভ্যুত্থান’ বিষয়ে চমকপ্রদ ঘটনা

বিজয়াবাংলা/আশরাফ/১৮ জুলাই ২১’

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন