চামড়ার দাম কমে যাওয়ায়:হতাশা কওমী মাদ্রাসা

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২২, জুলাই, ২০২১, বৃহস্পতিবার
<strong>চামড়ার দাম কমে যাওয়ায়:হতাশা কওমী মাদ্রাসা</strong>

বিজয় বাংলা ডেস্ক : পটুয়াখালী সদর উপজেলার বড়বিঘাই ইউনিয়নের দক্ষিণবিঘাই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা কাজী মাহাতাব উদ্দিন। বুধবার কোরবানির দিন বিকেলে মোবাইল ফোনে কথা হয় মাহাতাবের সাথে। ৪০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনে সাত ভাগে কোরবানি দিয়েছেন তারা। চামড়া কত টাকা বিক্রি করেছেন- জানতে চাইলে বলেন, চামড়া কেটে ভাগিরা নিয়ে গেছেন। কারণ কী, কেন বিক্রি করেননি- এমন প্রশ্নে মাহাতাবের উত্তর ছিল, ‘গত বছর কোরবানির চামড়া কেউ কিনেনি। বিক্রি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পচে গেছে। এবারও পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেটে ভাগিরা নিয়ে গেছেন।

বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর মতিঝিল ইত্তেফাক মোড় এলাকায় একজন চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ী কিছু চামড়া দু’জনকে সাথে নিয়ে ভ্যানে তুলছিলেন। চামড়ার দাম কেমন- জানতে চাইলে ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘ঘাটে (চামড়ার আড়ত) ৫০০-৫৫০ টাকা। একটি মাদরাসা এই চামড়াগুলো কালেকশন করেছিল। কিন্তু বেচতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আমি ৪৭৫ টাকা করে কিনে নিলাম। আশা করছি, ঘাটে ৫৫০ টাকা করে বেচতে পারবো।’

তখন পাশে দাঁড়ানো একজনের মন্তব্য ছিল, ‘চামড়ার দাম এত কম কেন? একটি গরুর দাম এক লাখ দেড় লাখ টাকা। আর সেই গরুর চামড়া বেচতে হচ্ছে ৫০০ টাকায়। এটা কি হয়? সব কিছুর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। আর গত ১০ বছরে চামড়ার দামই শুধু কমছে। এটা হয় না।’

চামড়ার দাম কেন কমছে?
বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর হাজারীবাগে রাস্তার দু’পাশে পড়ে ছিল শত শত পিস অবিক্রিত কোরবানির পশুর চামড়া। অবশ্য শুরুর দিকে গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৩৫০ ও ছাগলের চামড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে চামড়ার দাম ততই নিম্নমুখী হয়েছে। ফলে ইত্তেফাক মোড়ের ওই মৌসুমি ব্যবসায়ী তার কেনা চামড়াগুলো শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে পেড়েছেন কি না, তা আর জানা সম্ভব হয়নি।

হাজারিবাগ থানা থেকে কিছুটা দূরে রাস্তায় একপাশে চামড়া সংগ্রহ করছিলেন কয়েকজন। তাদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, দিনের বেলায় চামড়ার রেট কিছুটা ভালো ছিল। তবে রাত যত গভীর হবে রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে যত চামড়া ঢোকা শুরু করবে, চামড়ার রেট তত কমতে থাকবে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরের চামড়ার একটু কদর বেশি থাকে। কারণ বেশি দামের গরুর চামড়া থিকনেস বা পুরুত্ব বেশি হয়। আর ঢাকার বাইরে থেকে যে চামড়াগুলো আসবে সেগুলো একটু কোয়ালিটিতে খারাপ থাকে। এ কারণে ওই চামড়ার রেটও অনেক কম হয়।

তবে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যথাযথ তদারকির অভাবে ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণেই চামড়ার বাজারে বড় ধরনের দর পতন ঘটছে প্রতিনিয়ত। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়ছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে। তারা বলছেন, সরকার চামড়ার দাম বাড়ালেও আড়তদাররা কৌশলে দাম দিচ্ছেন না। সকালে যা একটু দর ছিল, দিনের শেষে সেই দাম আরো কমতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কোরবানির পশুর চামড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করে মৌসুমি ব্যবসায়ী, ফড়িয়া ও সারাদেশের শত শত কওমি-হাফেজি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা। তারা সেটা বিক্রি করে আড়তদারদের কাছে। সেখান থেকে চামড়া যায় ট্যানারিতে।

ট্যানারি মালিকরা কত দামে আড়তদারদের কাছ থেকে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করবে তা নির্ধারণ করে দেয় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

গত বছরের চেয়ে এ বছর সেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এবার প্রতি বর্গফুট গরু-মহিষের চামড়া ঢাকার ট্যানারি মালিকরা কিনবেন ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। গত বছর এই দাম ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরু বা মহিষের চামড়ার দাম হবে ৩৩ টাকা থেকে ৩৭ টাকা, গত বছর যা ২৮ থেকে ৩২ টাকা ছিল।

সারাদেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৭ টাকা, আর বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। কয়েক বছর আগেও যেসব চামড়া বিক্রি হয়েছে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায়, এবার সেসব চামড়ার দাম ২৫০ টাকার বেশি উঠছে না। এর জন্য সিন্ডিকেটকেই দায়ী করছেন অনেকে। যদিও এ অভিযোগ ঢাকার চামড়ার আড়ৎদররা মানতে নারাজ।

ক্ষতিগ্রস্ত কারা?
ইসলামের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা কোরবানিদাতা ভোগ করতে পারেন না। চামড়া বিক্রির পুরো টাকাই দান করে দিতে হয়। গরিবদের এই টাকা দেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, কোরবানির চামড়া বিক্রির উল্লেখযোগ্য অংশ যায় দেশের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। বিশেষ করে কওমি ও হাফেজি মাদরাসায় চলে যায় এই চামড়ার টাকা। এসব মাদরাসা ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের দানেই চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। সরকারের উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা পায় না এসব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। জাকাতের অর্থের পাশাপাশি কোরবানির পশুর চামড়ার টাকাই এসব মাদরাসার বার্ষিক আয়ের বড় অংশ বলে মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।

কিন্তু কোরবানির চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ও উল্লেখ্যযোগভাবে কমে গেছে গত কয়েক বছরে। মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের দাবি, মূলত দেশের কওমি মাদরাসাগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোরবানির চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ায়।

এমনটাই জানা গেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একাধিক কওমি মাদরাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের সাথে কথা বলে। এক্ষেত্রে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তারা।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 43
    Shares