রহীম ইসলামাবাদী-চাকচিক্যময় নগর নয়, দ্যুতি ছড়াচ্ছেন পাড়া গাঁ থেকেই

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১০, আগস্ট, ২০২১, মঙ্গলবার
রহীম ইসলামাবাদী-চাকচিক্যময় নগর নয়, দ্যুতি ছড়াচ্ছেন পাড়া গাঁ থেকেই

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, উত্তরা, ঢাকা
টিক টিক করে আপন গতিতে চলছে ঘড়ির কাঁটা। কাঁটাটি ঘুরছে আর মুহূর্তেই জীবন থেকে একটি একটি করে সেকেন্ড হারিয়ে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা চলার গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যারা জীবনকে সাজাতে পারে, তারাই জীবনে সফলতার সন্ধান পায়। ইতিহাস তাদের সফল মানুষ হিসেবে জায়গা দেয়। সফলতা আসলে কেমন, কোন কাজ কোন পর্যন্ত করলে তাকে সফল মানুষ বলা যাবে- এর সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে জীবনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম, আর এই সংগ্রামে হার না মানাই সফলতা। এমন সফলতা জন্য প্রয়োজন পরিশ্রম, বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সৃজনশীলতা।

সমাজে যারা আলোকিত মানুষ, বিদগ্ধজন তাদের অবস্থান যত উঁচুতেই থাকুক তারা তত বেশি বিবেচক-বিনয়ী, কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অগ্রগণ্য, সংযত ও ঔচিত্ববোধের সীমায় তাদের অবস্থান, বাক্যালাপে পরিশীলিত, তারা কখনো অহংকার-অহমিকা ও দাম্ভিকতা প্রকাশ করেন না। সমাজ তাদের সেজন্য উচ্চমর্যাদায় বরণ করে নেয়। তা ছাড়া তাদের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি আর বিবেচনা সমাজকে বহু আপদ-বিপদ থেকে রক্ষা করে।

সাধারণভাবে একটা কথা প্রচলিত, ফলবতী বৃক্ষ তার ফল ভারে নুয়ে পড়ে। আর যে বৃক্ষ বন্ধ্যা তা কেবল ওপরের দিকে উত্থিত হয়। যদিও এমন ফলবতী বৃক্ষ খুব বেশি মেলে না, তবে একেবারেই যে মেলে না, তা কিন্তু নয়; খুঁজে নিতে হয় এমন বৃক্ষ। এমনই ফলবতী বৃক্ষের উপমা ও আলোকিত একজন মানুষ হলেন- মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম ইসলামাবাদী।

মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী একজন বিজ্ঞ আলেম, সচেতন ইতিহাসবিদ, চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ রাজনীতিক, আদর্শ শিক্ষক, গবেষক, আধ্যাত্মিক সাধক, লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক।

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম ইসলামাবাদী চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার অন্তর্গত পূর্ব সুয়াবিল ভাঙ্গাদিঘীরপাড় গ্রামে ১৯৬৪ সালের ১৩ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম হাজী আরেছ মিয়া (রহ.), মাতার নাম নুরজাহান বেগম। দাদা হজরত মাওলানা আবদুস সাত্তার (রহ.) একজন বুজুর্গ আলেম ছিলেন। তিনি দেশের অন্যতম দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাটহাজারী মাদরাসা, দিল্লীর বিখ্যাত আবদুর রব মাদরাসা ও দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষা লাভ করেন। হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) ও কতুবে আলম আল্লামা শাহ জমীরুদ্দীন সুয়াবিলী (রহ.) তার পীর ও মুরুব্বি ছিলেন।

মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী পূর্ব সুয়াবিল জমিরিয়া হোসাইনিয়া তাবলিগুল কোরআন মাদরাসায় প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেন এবং দক্ষিণ সুয়াবিল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়ে ৫ম শ্রেণি পাস করেন। পরে আল জামিয়াতুল আরাবিয়া নাছিরুল ইসলাম নাজিরহাট বড় মাদরাসায় কিছুদিন হেফজ পড়েন। পরবর্তীতে কিতাব বিভাগে ভর্তি হয়ে জামাতে উলা পর্যন্ত অধ্যায়ন করে হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হন এবং এখান থেকেই ১৯৮২ সালে দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করে ‘মাওলানা’ সনদ লাভ করেন। পরে মুফতিয়ে আজম আল্লামা মুফতি আহমাদুল হক (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে কিছুদিন ফেকাহ, তাফসির ও তাজবিদ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।

মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে দাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিল (হাদিস, তাফসির, ফেকাহ) পাশ করেন। তন্মধ্যে কামিল (হাদিস) নাজিরহাট মাহমুদিয়া আলিয়া মাদরাসায় এবং কামিল (ফিকাহ) সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ঢাকায়। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। চট্টগ্রাম কলেজে আইন বিষয়েও শিক্ষা অর্জন করেন।

মূলত শিক্ষা অর্জনের প্রতি তীব্র আকাঙ্খা থেকে উপকারী ও প্রয়োজনীয় বিষয়ে তিনি ডিগ্রি হাসিল করতে চেয়েছেন। জ্ঞানার্জন আর বুজুর্গদের সান্নিধ্য লাভ তিনি সদা ব্যাকুল থাকতেন। এই ব্যাকুলতা তাকে লেখালেখির ময়দানে নিয়ে আসে। মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী আমিরে শরিয়ত হজরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) ও হজরত আল্লামা সৈয়দ আবুল হাসান আলী মিয়া নদভী (রহ.)-এর মুরিদ। চার তরিকার ইজাজতপ্রাপ্ত আধ্যাত্মিক এই সাধক সুলুক ও তাসাউফের মেহনতে খলিফায়ে মাদানি আল্লামা আবদুস সাত্তার শাহ (রহ.), মুফতিয়ে আজম আল্লামা মুফতি আহমদুল হক (রহ.), শায়খুল হাদিস আল্লামা আবদুল আজিজ (রহ.) ও শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)সহ বেশ কয়েকজন বুজুর্গের খেলাফত পেয়েছেন।

সুদীর্ঘ ৪৩ বছর যাবৎ তিনি সাংবাদিকতা, গবেষণা ও সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত। সাপ্তাহিক জমিয়ত, মাসিক আর রশীদ, মাসিক পয়গামে হক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত ইসলামি বিশ্বকোষের একজন লেখক তিনি। এছাড়া দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক নয়াবাংলা, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ, সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান, সাপ্তাহিক জমিয়ত, মাসিক মদীনা, মাসিক মুঈনুল ইসলাম, মাসিক আর রশীদ, মাসিক দাওয়াতুল হক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া, মাসিক আত তাওহীদ, মাসিক আল হক, মাসিক অগ্রপথিক, মাসিক ফটিকছড়ি, মাসিক ফটিকছড়ি সংবাদ, দ্বি-মাসিক তাকবীরসহ অসংখ্য পত্র-পত্রিকায় তার বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে একটি কথা না বললেই নয়, এখন থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের কোনো ইসলামি ব্যক্তিত্ব, বুজুর্গ, বড় আলেম, নামকরা লেখক ও আলোচিত পীরদের কেউ মারা গেলে দ্রুততার সঙ্গে তার জীবনী লিখে তা বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিকে প্রকাশের ব্যবস্থা করতেন তিনি। এ বিষয়ে তার উদাহরণ তিনিই।

এখন থেকে প্রায় দুই যুগ আগে থেকে মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদীকে দেখেছি, শান্ত-সৌম্য চেহারায় এক ধরনের ব্যাকুলতার ছাপ। উম্মাহর দরদে অস্থির এক লেখক। সকাল-বিকাল, রোদ-বৃষ্টি, শীত আর গরমের তীব্রতা উপেক্ষা করে, কখনো রিক্সায়, কখনো পায়ে হেঁটে ছুটে চলছেন। হাতে কাগজ কিংবা পত্রিকা। সংসারের অভাব-অনটন সত্ত্বেও শুধুমাত্র ইসলামি রাজনীতি এবং লেখালেখির পেছেনে তিনি অনাহারে-অর্ধাহারে ব্যয় করেছেন তার জীবনের মূল্যবান প্রায় চার যুগ সময়।

মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘মাসিক পয়গামে হক’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং ‘সাপ্তাহিক জমিয়ত’-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী (রহ.), বাবায়ে জমিয়ত মাওলানা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রহ.), মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.) সহ অসংখ্য প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও লেখকের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।

মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী প্রায় এক যুগ আগে ঢাকা ছেড়ে নিজ এলাকায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে তা পরিচালনা করছেন। সে হিসেবে বলা চলে, তিনি এখন নিভৃত এলাকায় থেকে সুলুক, তালিম ও লেখালেখির কাজেই বেশি সময় পার করছেন। তার রচিত কয়েকটি বই হলো- ইসলাম ও বিশ্বশান্তি (অনুবাদ), হায়াতে মাওলানা হারুন বাবুনগরী, মাকামে সাহাবা (অনুবাদ), কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা, নারীদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, তারীখে ইসলাম, হায়াতে আতহার, হযরত হাফেজ্জী হুজুর ও তাঁর দ্বীনি দাওয়াত, আনোয়ারে সুলতান, সীরাতে সৈয়দ আহমদ শহীদ, আযীযুত্তালেবীন, শায়খ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাবের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং ভারতবর্ষের ওলামাদের তার প্রতিক্রিয়া, ইসলামী জীবনব্যবস্থা, হযরত মাদানীর নির্বাচিত রচনাবলী, আলেম সমাজের ইতিহাস, নাজিরহাট বড় মাদ্রাসার ইতিহাস, বোয়ালিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস ও মাওলানা তুরাব উদ্দীন রহ., ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনায় নারী, বাংলাদেশে দেওবন্দ পদ্ধতির শিক্ষা ও সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাস, দারাখ কান্তা সেতারে (অনুবাদ), আদালত খান, খিলাফত আন্দোলন কি চায়, কেন চাই, কিভাবে চাই- ইত্যাদি। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য জীবনী, সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রচুর প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছেন। আমরা মনে করি, দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে প্রকাশিত লেখাগুলো সংকলিত ও বই আকারে প্রকাশ হওয়া উচিৎ।

২০০৭ সালে মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী নিজ এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষের উৎসাহ, আবদার ও সাহায্য-সহযোগিতায় এবং শায়খুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফী (রহ.)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব সুয়াবিল তালিমুল ইসলাম বালিকা (দাওরায়ে হাদিস, টাইটেল/দাখিল) মাদরাসা। বর্তমানে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করছেন।

ইতোমধ্যেই মাদরাসাটির অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিন তলাবিশিষ্ট মসজিদ-মাদাসা নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। আরও কিছু কাজ চলমান। মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদীর একান্ত ইচ্ছা ও আশা, উচ্চতর বালক শাখা চালুকরণ, কম্পিউটার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সাহিত্য ও সাংবাদিকতা বিভাগ, উচ্চতর ইসলামি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।

মাদরাসার সঙ্গে মাদানি মসজিদ ও খানকাহে এমদাদিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রতি সোমবার খানকায় ইসলাহি মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী ইবনে বতুতা ছদ্মনামে লেখালেখি করতেন। তিনি ইসলামি রাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী। খেলাফত আন্দোলন দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। ১৯৮৬ সালে তিনি ফটিকছড়ি থেকে বটগাছ প্রতীকে এবং ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম সদর আসন থেকে মিনার প্রতীকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। পরবর্তীতে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

পারিবারিক জীবনে তিনি দশ সন্তানের জনক। বিয়ে করেছেন নাজিরহাটে। চার ছেলের মধ্যে ৩ জন হাফেজে কোরআন অন্যজন হেফজ পড়ছেন। বড় দুই ছেলে মাওলানা ও মুফতি। মেয়েদের তিনি দ্বীনী শিক্ষা শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তার স্ত্রীর নাম নুর নাহার বেগম।

মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশ, জাতি ও ইসলামের খেদমতে। তার সংগ্রামী জীবন, জ্ঞান সাধনা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র তিনি পাননি। তাই প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শহর ছেড়ে শুধু জীবনের তাগিদে নিজ এলাকায় চলে যান। এটা নিয়ে তার কোনো ক্ষোভ, অভিযোগ কিংবা আক্ষেপ নেই। গ্রামে যেয়েও তিনি নিজেকে হারিয়ে যেতে দেননি। ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তার এই অসামান্য ত্যাগের কোনো স্বীকৃতি কিংবা মূল্যায়ন আমরা করতে পারিনি। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের পরম ব্যর্থতা।

সহজ-সরল মানুষের প্রতিকৃতি মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদীর মাঝে নাম-যশ ও খ্যাতির কোনো মোহ নেই। তার সব কাজ নিবেদিত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এটাকে তিনি মনেপ্রালে লালন-পালন করেন বিধায় আলো ঝলময় নগর ছেড়ে অজপাড়া গাঁয়ে থেকেও তিনি আলো ছাড়াচ্ছেন সমানতালে। বিগত চল্লিশ বছরের ইসলামি আন্দোলন, ইসলামি রাজনীতির গতি-প্রকৃতি খুব কাছে থেকে দেখেছেন। পূর্বসূরিদের দর্শন ও চেতনাকে লালন করে তা প্রতিষ্ঠিত করতে নিরলসভাবে শ্রম দিয়েছেন। তরুণ প্রজন্ম তাকে তাকে পেলে, তার সান্নিধ্য পেলে উপকৃত হতো, জীবনে ঋদ্ধ হতো। জীবনে সংগ্রাম-সাধনা, টানাপোড়েন ও চড়াই-উৎরাইয়ের মুহূর্তে কীভাবে হকের পথে অটল-অবিচল থাকা যায় কিংবা থাকতে হয়, এটা মাওলানা ইসলামাবাদীকে না দেখলে বোঝা যাবে না। তরুণ প্রজন্মের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে তার জীবন থেকে।

শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ার কথা প্রায়ই উচ্চারিত হয়। মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদীর ক্ষেত্রেও এ কথা বললে বেশি বলা হবে না। কবি-সাহিত্যিক, লেখক-সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের সম্পর্ক সহজাত ভালোবাসার। কিন্তু তাদের জন্য সাহিত্যচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি ও পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে রাখা- কোনোভাবেই কল্যাণকর কিছু নয়। ইসলামের প্রচার-প্রসারে এই মাধ্যমে কাজের লোক সৃষ্টি কিংবা কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা যতদিন আমরা অনুভব না করবো- ততদিন ইসলামকে বিজয়ীর বেশে দেখা সম্ভব হবে না।

যেকোনো মহৎ কাজ পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত সম্পন্ন হতে পারে না। সমকালীন মুসলিম শাসকগণ সাহিত্যচর্চায় ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে বলে ইতিহাসে পড়েছি। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় কবি-সাহিত্যিকদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করেছিলেন। আজকাল ইসলামি সাহিত্য কিংবা আদর্শ সাহিত্যচর্চায় বেশ প্রতিবন্ধকতা লক্ষ করা যায়। এখনও অনেকেই আছেন, যারা ধর্মে সাহিত্যচর্চা হতে পারে বলে বিশ্বাস করেন না। বলি, এটা তাদের অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। সত্যিকার সাহিত্যচর্চা কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের ক্ষেত্রেও হতে পারে।

বিগত এক হাজার বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে এবং নিরপেক্ষভাবে তা পর্যালোচনা করলে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, বাংলা সাহিত্যের উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি ঘটাকে মুসলমান শাসকরা নিঃস্বার্থভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে। এটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ, এই আলোচনা অন্যদিন।

বলছিলাম পৃষ্ঠপোষকতা প্রসঙ্গে, যা ছাড়া সাহিত্যচর্চা এগুতে পারে না। এক্ষেত্রে আমাদের অসচেতনতা ও হীনম্মন্যতাবোধে পেয়ে বসেছে। পত্রিকা-সাময়িকী হরদম বের হচ্ছে, এক, দুই সংখ্যা বের হওয়ার পর আর দেখা যায় না। কারণ, পৃষ্ঠপোষকতা পায় না, কিংবা ঠাট্টা-অবহেলার শিকার হন। লিখিয়েদের কাছে লজ্জাবোধটা মনে হয় সবচেয়ে বেশি, কারণ তারা চাইতে পারেন না বা এ ব্যাপারে যথেষ্ট দুর্বলতা আছে। জানলেও চক্ষুলজ্জার কারণে কিছু বলতে পারেন না। এক্ষেত্রে সমাজের সমঝদারদের এগিয়ে আসতে হবে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা না থাকলে মানুষ সভ্য হয় না। মানুষের প্রতিভা বিকশিত হয় না। গুণীর জন্ম হয় না।

সুস্থ সমাজ ও দেশ বিনির্মাণে আমাদের একদল সৎ ও সাহায্যকারী পৃষ্ঠপোষক দরকার। এ জন্য নানামুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে, গণসচেতনার মাধ্যমে অপসংস্কৃতির মোকাবিলা করতে হবে। এ ধরনের ত্যাগের মানসিকতা না থাকলে সাংস্কৃতিক জাহেলিয়াত আরো চেপে বসবে। আর মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদীদের মতো মেধা থেকে জাতি উপকৃত হওয়ার সুযোগ হারাবে।

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম ইসলামাবাদীর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার সময় তার মুখভঙ্গিমা আমি কল্পনায় আঁকার চেষ্টা করেছি। তাতে আক্ষেপের বিন্দুমাত্র ছাপ দেখিনি। তবে তার মুখনিঃসৃত একটি কথা এখনও ভুলতে পারিনি। তাহলো- ‘আমি ইসলামি রাজনীতি কিংবা লেখালেখি, যাই করেছি বা করছি- সবই এলায়ে কালেমাতুল্লাহর জন্য। মাওলাকে রাজিখুশি করার জন্য। দুনিয়ার কোনো স্বার্থ বা চিন্তা করিনি।’

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম ইসলামাবাদীর এই চেতনা হালময়ের তরুণ লেখকদের মাঝে জাগ্রত হোক- এই প্রত্যাশা করছি। সেই সঙ্গে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম ইসলামাবাদীর নেক হায়াত ও শান্তিময় জীবন কামনা করছি। আল্লাহতায়ালা আমাদের মাকাসিদে হাসানা ও নেক কাজগুলো কবুল করুন। আমিন।

বিজয়বাংলা/আশরাফ/১০ আগস্ট ২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন