বিলুপ্ত প্রজাতির কুমির আবার পরিবেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা বিশেষজ্ঞদের

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১২, আগস্ট, ২০২১, বৃহস্পতিবার
বিলুপ্ত  প্রজাতির কুমির আবার পরিবেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা বিশেষজ্ঞদের

ন্যাশনাল ডেস্কঃ ফরিদপুরের একটি জলাশয়ে আশ্রয় নেয়া মিঠা পানির একটি কুমির উদ্ধারের পর বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই প্রাণীকে আবারো পরিবেশে ফিরিয়ে আনার আশা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফরিদপুর থেকে উদ্ধার হওয়া কুমিরটি নারী কুমির, যেটির সাথে বাংলাদেশের বন বিভাগের কাছে থাকা মিঠা পানির পুরুষ কুমিরের প্রজননের মাধ্যমে এই প্রজাতির কুমিরের বংশবিস্তার এবং এটিকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে তারা মনে করছেন।

পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব নেচার) মিঠা পানির কুমিরকে বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে ২০০০ সালে।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বিলুপ্ত ঘোষণা করার আগে এই ধরনের কুমির বাংলাদেশের জলাধারগুলোতে শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৬২ সালে।

ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নে পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত একটি খাঁড়ি বা খালে সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া কুমিরটিকে প্রথম দেখা গিয়েছিল জুলাই মাসের শেষদিকে। তারপরের এক সপ্তাহে তিনবার চেষ্টা করেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা ও স্থানীয়রা কুমিরটি উদ্ধার করতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত গত সোমবার বন বিভাগের একটি দল কুমিরটিকে উদ্ধার করে। পরে সেটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেয়া হয়। সেখান থেকে কুমিরটিকে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।

এর আগে ২০১৫ ও ২০১৮ সালে দুটি মিঠাপানির কুমির উদ্ধার করা হয়েছিল, যেগুলোকে গাজীপুরের সাফারি পার্কে রাখা হয়েছিল। সাফারি পার্কের এই কুমিরগুলোর সাথে নতুন করে উদ্ধার করা কুমিরটির প্রজননের মাধ্যমে এই প্রজাতির বংশবিস্তারের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

মিঠা পানির কুমির পুনর্বাসন হবে কীভাবে?
বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও এখানকার জলাশয়ে মিঠা পানির কুমির পুনর্বাসনের মাধ্যমে এই প্রজাতিটি আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে ধারণা প্রকাশ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ফরিদ আহসান, যিনি মিঠা পানির কুমিরের ডিম ফোটার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে গবেষণা করেছেন।

অধ্যাপক আহসান বলেন, “মিঠা পানির কুমির ছাড়লে সব জায়গায় হয়তো এটি টিকে থাকবে না, কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় অবশ্যই সম্ভব।”

তবে কোন এলাকায় কুমির ছাড়ার আগে সেটা এই ধরনের কুমিরের বাস করার জন্য উপযুক্ত কি না, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করে নিতে হবে। কুমির ছাড়ার পর সেগুলোর গতিবিধি এবং জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে, বলেন মি. আহসান।

সম্ভাব্যতা যাচাই করতে যে সময় প্রকৃতিতে কুমির ছাড়া হবে, তখন রেডিও ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কুমিরগুলোর ওপর নজর রাখলে তাদের জীবনযাত্রা ও গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

পাশাপাশি যেখানে কুমির ছাড়া হবে সেই এলাকায় কুমিরের ডিম পাড়ার মত পরিবেশ রয়েছে কি না, তা যাচাই করে নেয়া আবশ্যক।

“যেখানে কুমিরগুলো ছাড়া হবে, সেখানে জলাধারের পাড়ে উঠে যেন তারা ডিম পাড়তে পারে সেরকম জায়গা থাকা প্রয়োজন। ডিম পাড়লে সেগুলোকে সেখানেই সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিলে ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আবার চাইলে কৃত্রিমভাবে ইনকিউবেটরেও ডিম ফোটানো যায়।”

ডিম ফোটার পরও কুমিরের যতগুলো বাচ্চা হয়, তার মধ্যে অনেকগুলোই নানা কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেই মারা যায়। সেরকম পরিস্থিতি হলে প্রাথমিক ধারণার চেয়ে কম সংখ্যক কুমির বেঁচে থাকলেও সবগুলো কুমির মারা যাবে না বলে মন্তব্য করেন মি. আহসান।

“প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কুমির ছাড়লে তারা যে একেবারে শেষ হয়ে যাবে, তা বলা যাবে না। আবার বংশবিস্তার হবেই, এরকমও নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। কিন্তু একসময় যেহেতু ছিল, তাই কিছু অন্তত টিকে থাকবে, এমন আশা করা যায়।”

মিঠা পানির কুমির কেন বাংলাদেশে টিকে থাকতে পারে না?
মিঠা পানির কুমিরের ডিম ফোটার সমস্যার কারণগুলো নিয়ে অধ্যাপক ফরিদ আহসান যে গবেষণাটির সহ গবেষক ছিলেন, সেই গবেষণাটি ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ।

কক্সবাজারের ডুলা হাজরার সাফারি পার্কে থাকা ২৯টি কুমিরের ওপর ঐ গবেষণাটি চালানো হয় ২০০৭ এর জুন থেকে ২০০৮ এর মে পর্যন্ত।

ঐ গবেষণায় উঠে আসে যে পানির গভীরতা কম হওয়া, জলাধারের পার্শ্ববর্তী বালির তীর প্রয়োজনের চেয়ে সরু হওয়া এবং সেখানে ডিম পাড়ার মত উপযুক্ত পরিবেশ না থাকা, উচ্চ তাপমাত্রা এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত মিঠা পানির কুমিরের বংশবিস্তারের সম্ভাবনা কমানোর প্রধান কারণ।

বাংলাদেশের জলাশয়গুলোতে মিঠা পানির কুমির বেঁচে থাকার মত পরিবেশ থাকলেও মানবসৃষ্ট নানা কারণে এই অঞ্চলে কুমির টিকে থাকতে পারে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এছাড়া প্রাকৃতিক নানা কারণেও মিঠা কুমিরের ডিম ফোটা এবং বাচ্চা হওয়ার পর সেগুলো টিকে থাকে না।

“কুমির কিছুটা বালি খুঁড়ে ডিম পাড়লেও অনেক প্রাণীই কুমিরের ডিম খেয়ে ফেলে। গুইসাপ, শিয়াল বা সাপ কুমিরের ডিম খেয়ে ফেলে। গুইসাপ বা শিয়াল সুযোগ পেলে কুমিরের বাচ্চাও খেয়ে ফেলে।”

তবে অধ্যাপক আহসান মনে করেন এই ধরনের কুমির কমে যাওয়ার প্রধান কারণ জলাশয়ে তাদের খাদ্যের সঙ্কট।

“এই ধরনের কুমির সাধারণত মাছের ওপর নির্ভর করে। নদীনালা, জলাশয়ে মাছ কমে যাওয়াই এই ধরনের কুমির কমে যাওয়ার মূল কারণ।”

বিজয়বাংলা/এনএম/১২/৮/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 47
    Shares