সীরাতে মুস্তাকীম

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১২, সেপ্টেম্বর, ২০২১, রবিবার
<strong>সীরাতে মুস্তাকীম</strong>

আব্দুল্লাহ আল মাসউদঃ রাস্তার আরবী জানতে চাইলে আরবীভাষা জানা যে কোন মানুষের মুখে সর্বপ্রথম যে শব্দটা এসে থাকে তা হলো ত্বরীক। এটিই মূলত রাস্তার জন্য ব্যবহৃত মূল শব্দ। কিন্তু এর বাইরে রাস্তার জন্য আরো কয়েকটা শব্দ আছে আরবীভাষাতে। যেমন- সাবীল, সীরাত ইত্যাদি।

সূরা ফাতিহার বদৌলতে আমরা সীরাত শব্দের সাথে সবাই পরিচিত। নামাজের প্রতি রাকাতেই আল্লাহর সামনে বলতে হয়-
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম। অর্থাৎ, আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিন।

কখনো কি আপনার ভাবনার প্রান্তরে এই প্রশ্ন উদিত হয়েছে যে, সূরা ফাতিহাতে রাস্তার সবচে প্রসিদ্ধ শব্দটি এড়িয়ে গিয়ে আল্লাহ তাআলা কেন সীরাত শব্দটি বেছে নিয়েছেন? এই বিষয়টাই এখন আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

এই প্রশ্নের সবচে সুন্দর উত্তর ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ‘বাদাইউল ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে দিয়েছন। তাঁর কথাগুলোই আমি আমার মত গুছিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি।

সীরাত শব্দের মূল অর্থ হলো কোন জিনিসকে খুব কোমলভাবে গিলে খেয়ে সমাপ্তিতে পৌঁছে দেওয়া। রাস্তা তার ভেতর দিয়ে চলমান ব্যক্তিকে কেমন যেন নিজের উদরে গিলে নেয়। এটা হলো শব্দটার মূল অর্থের সাথে রাস্তার মিল।

একটা রাস্তাকে সীরাত বলার জন্য তার ভেতর বাড়তি কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। সেগুলো হলো-
১. রাস্তাটি আঁকাবাঁকা না হয়ে সোজা হওয়া।
২. রাস্তাটি পাথুরে না হয়ে নরম ও কোমল হওয়া।
৩. সুন্দরভাবে চলার উপযোগী হওয়া।
৪. যথেষ্ট প্রশস্ত হওয়া।
৫. রাস্তাটি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছার মাধ্যম হওয়া।

এই পাঁচটা বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গঠিত রাস্তাকেই সীরাত বলে নামকরণ করা হয়। যে রাস্তা আঁকাবাঁকা বা এবড়ো-থেবড়ো ও অপ্রশস্ত তাকে কখনও সীরাত বলা হয় না।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সীরাত শব্দটা এসেছে আরবী ‘ফিআল’ ওজন বা প্যাটার্নে। এটি এমন বস্তুর নামের জন্য অধিক ব্যবহৃত, যা নিজের ভেতর কয়েকটি জিনিসকে একসাথে ধারণ করে। যেমন-
লিহাফ তথা লেপ, যাতে একগাদা তুলা ভর্তি থাকে।
কিতাব তথা বই, যা অনেক পৃষ্ঠা সম্বলিত হয়ে থাকে।
ফিরাশ তথা বিছানা, যা অনেকগুলো জিনিস মিলে হয়।

এখানে একটা প্রশ্ন হতে পারে যে, কুরআনে এক জায়গায় জাহান্নামের সাথে সীরাত শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে। এর কারণ কী? আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
احْشُرُوا الَّذِينَ ظَلَمُوا وَأَزْوَاجَهُمْ وَمَا كَانُوا يَعْبُدُونَ (22) مِنْ دُونِ اللَّهِ فَاهْدُوهُمْ إِلَى صِرَاطِ الْجَحِيمِ
“যারা জুলুম করেছে (আল্লাহর সাথে শিরক করার দ্বারা) এবং তাদের সঙ্গী-সাথী ও তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদাত করেছে ওদেরকে একসাথে করো এবং তাদেরকে জাহান্নামের পথে হিদায়াত করো (অর্থাৎ, জাহান্নামের রাস্তায় নিয়ে চলো।)” (সফফাত:২২-২৩)

আমরা আগেই বলেছি, সীরাত মানে নরম, প্রশস্ত ও সোজা রাস্তা। যেটা দিয়ে খুব সহজেই গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয় না। তো এখানে জাহান্নামীদের জন্য দুইটি শব্দ এসেছে। এক. হিদায়াত। দুই. সীরাত। এই দুইটা শব্দই তাদের জন্য ব্যঙ্গ ও উপহাস স্বরূপ আনা হয়েছে। একে আরবী বালাগাত বা অলঙ্কার শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘তাহাক্কুম’ বলে। সেটা কিভাবে ব্যাখ্যা করছি।

প্রথমত হিদায়াত মানে হলো পথ বাতলে দেওয়া। যেন পথিক তার যথাযথ গন্তব্যে সহজে ও দ্রুত পৌঁছে যেতে পারে। কাফেররা যেহেতু দুনিয়াতে আল্লাহর সাথে শিরক করেছে তাই তাদের মূল গন্তব্য হলো জাহান্নাম। তারা দুনিয়াতে আল্লাহ প্রদত্ত জান্নাতে যাওয়ার আগ্রহও রাখেনি। কারণ তাদের পরকালের জান্নাত-জাহান্নামের ওপর বিশ্বাসই ছিল না। সুতরাং তাদেরকে দ্রুত আপন আপন গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ফেরেশতাদের আদেশ করা হবে। কেমন যেন, যেখানে যাওয়ার জন্য দুনিয়াতে তারা সারাজীবন শিরক-কুফর করেছে সেখানে তাদেরকে দ্রুত পাঠানোর বন্দবস্ত করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত কাফের বাহিনীর সেই গন্তব্যে দ্রুত ও সহজে পৌঁছতে যেন অসুবিধা না হয় তাই দরকার একটি প্রশস্ত ও সমতল রাস্তার। যেখান দিয়ে তাদের দ্রুত হাঁকিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তো জাহান্নামে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য যেমন রাস্তা দরকার সেটার প্রয়োজনেই এখানে সীরাত আনা হয়েছে। এটা তাদের জন্য কল্যাণকর নয়; বরং অকল্যাণকর ও দ্রুত শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার মাধ্যম।

বিজয়বাংলা/এনএ/১২/৯/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 13
    Shares