যৌন নিয়ন্ত্রণে সভ্যতার বিকাশ

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৪, সেপ্টেম্বর, ২০২১, মঙ্গলবার
যৌন নিয়ন্ত্রণে সভ্যতার বিকাশ

মানব সমাজ আজকে এমন একটা সময় পার করছে যাকে বলা যায় আধুনিকতার চরম উৎকর্ষ ও উন্নতির যুগ। এক সময় যেখানে মানুষ সফরে পথ পাড়ি দিত সপ্তাহ, মাস, বছরের সময় নিয়ে, সেখানে আজকে মানুষ সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে এনেছে মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে। মানব সভ্যতার এই আকাশচুম্বী বৈজ্ঞানিক বিপ্লব মানুষের জীবনযাত্রা সহজ,স্বাচ্ছন্দ্যময় ও বিলাসবহুল করেছে। একটা সময় মানুষের মাঝে যেমন আকাশ ও পৃথিবী সম্পর্কে কাল্পনিক ধারণা ও চিন্তা চেতনা প্রচারিত ও প্রসারিত ছিলো, আজকে সেখানে মানব সভ্যতা চাঁদ ও মঙ্গলের মতো বড় বড় গ্রহ-উপগ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে মানব সভ্যতার এই যান্ত্রিক ও বস্তুগত উন্নয়ন মানুষের রুচিশীলতা ও মানবতাকে কিছু দিতে পারেনি। বস্তুগত ক্রমবর্ধমান দ্রুত উন্নয়নশীল এই সভত্যা মানুষ ও মানবিকতা দিতে পারেনি তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের কোন রূপরেখা কিংবা খোরাক। বরং বস্তুগত উন্নয়ন মানবতার পাশবিকতাকেই আরো উস্কে দিয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে বস্তুগত দিক দিয়ে আর অবনতি হয় হয়েছে নীতি নৈতিকতা শিষ্টাচার অবাধ যৌনতার দিক দিয়ে। হায়া-লজ্জা-শরম, শালীনতা ও লাজুকতা আজকে যেন গ্রীক পুরাণের গল্প উপন্যাসের মত নিছক কিছু কেচ্ছা কাহিনী, অথবা এমন কোন কিছু যা শুধু রূপকথার গল্পের মধ্যেই ভালো লাগে, বাস্তব জীবনে এর না আছে কোন পদরেখা আর না আছে কোন চিহ্ন। অন্ততপক্ষে পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থার করুন চিত্র দেখে তাই মনে হয়।

 

মানব জীবনে আসলে জাগতিক ও বস্তুগত উন্নয়ন চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা, সামাজিকতা, নৈতিক বিবেচনাবোধ আত্মা ও আত্মিকতার কঠোর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন। এ ছাড়া একটা সমাজ জাগতিক দিক দিয়ে যত উন্নয়ন আর উৎকর্ষতা লাভ করুক না কেন, তার ধ্বংস অনিবার্যভাবে হবেই। কারণ যেখানে সামাজিকভাবে মানুষ মানুষত্ব নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচতে পারে না, সেখানে জাগতিক ও বস্তুগত উন্নয়ন আসলে রাজা আছে, রাজ্য নেই, ঘর আছে; কিন্তু থাকার মানুষ নেই- এমন একটা অবস্থা। এটা শুধু আজকে আমাদের দেশ কিংবা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সমূহের অবস্থা নয়, বরং গোটা বিশ্ব ও মানবজাতির আজকে এই বেহাল দশা ও করুন পরিণতি। মানুষ ও মানবিকতা আজকে বস্তুবাদী এই সভ্যতার দিকে চাতক পাখির মতো তাকি আছে মানব অন্তরে প্রশান্তি লাভের কোন জদুকরি তত্ত্বাকথার জন্য কিংবা সমুদ্রের ঝিনুকের মত ‘হা’ করে আছ এক পশলা বৃষ্টির পানির জন্য। কিন্তু তার এই তাকিয়ে থাকা আর অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, দিন হারিয়ে যাচ্ছে, কালের পর কাল ও যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এই অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর যেন শেষই হচ্ছে না। যন্ত্র ও যান্ত্রিকতার এই চরম উৎকর্ষের যুগে কারোরই সুযোগ হচ্ছে না একটাবার মানবতার রোগাক্রান্ত শরীরের দিকে মায়াভরা চাহনিতে তাকিয়ে দেখি কিংবা এর একটু সেবা শুশ্রূষা করি যাতে যন্ত্রের যান্ত্রিকতা ও উন্নয়নের সাথে মানুষ ও মানবিকতা আর কিছুদিন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারে।

 

তবে মানব সভ্যতার এই আশ্চর্য পতন কিন্তু একদিনে হয়নি, এই পতনের পেছনে রয়েছে একটা দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যেটা প্রতিটা কাল, দেশ, গোত্র জাতিভেদে অভিন্ন। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বলেন-

 

وتلك الايام نداولها بين الناس

“আর এই দিন পরিক্রমা, যা আমি মানুষের মাঝে পালাক্রমে বদলাতে থাকি।”[১]

 

সেই একই প্যাটার্নের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলছে এই যুগের মানুষের উপর।

 

প্রাথমিকভাবে মানবতার পতনের জন্য দায়ী করা যায়, মানুষ্য মনের পাশবিকতা, সীমাহীন চাহিদা,ভোগ বিলাসীতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপক প্রচলন, সামাজিকতা ও নৈতিকতার পতন এবং সর্বশেষ অবাধ যৌনতার বিস্তার ও বিকৃত যৌনাচারের বাঁধ ভাঙা জোয়ার। তাহলে বলা যায় এই পশ্চিমা সভ্যতার ধ্বংস প্রক্রিয়া তার ধারাবাহিক পতনের সর্বশেষ ধাপে বিদ্যমান রয়েছে। আর এই শেষ ধাপটাই আজকে আমাদের দেশ ও সমাজের বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের কথিত বুদ্ধিজীবীরা ধর্ষণ ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে যৌনতাকেই ব্যাপক আকারে পতিতা বৃত্তির নামে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। আমরা জানি এক হাত দিয়ে অন‌্য হাতে ছুরি দিয়ে আঘাত করলে হাত কেটে যাবে, আর হাত না কাটার সমাধান হিসেবে আমাদেরকে বলা হচ্ছে হাতটা একেবারে শরীর থেকে আলাদাই করে ফেলি, তাহলে আর ছুড়ি দিয়ে হাত কাঁটার কোন ভয় নেই। অবাধ যৌনাচার ও পতিতা বৃত্তির ব্যাপক প্রচলন কখনো ধ্বংসশীল ও ক্ষয়িষ্ণু সামাজিকতা ও সভ্যতার পতনকে ঠেকাতে পারবে না। লিবারেল পশ্চিমাদের মগজ ধোলাই হয়ে কিংবা টাকার বিনিময়ে নিজের নীতি ও নৈতিকতা বিক্রি করে পতনশীল সভ্যতার কার্যক্রম আমাদেরকেও কূপের মধ্যে ফেলবেন না এই নিশ্চয়তা কতটুকু? বরং এটাই যৌক্তিক ও বাস্তব সম্মত যে তাদের অনুসরণ ও অনুকরণ আমাদের নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা সামাজিকতা, আন্তরিকতা,শালিনতা ধ্বংসের একমাত্র কারণ। যেটা আমরা এখন চরমভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।

 

ধর্ষণ ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে যৌনতাকেই ব্যাপক আকারে প্রচলন করার প্রচেষ্টা অতীতের মাযদাকি আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। মাযদাক (৪৮৭খৃ.) ছিলো এই আন্দোলনের মূল হোতা। তার আদর্শ ছিল-“মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে পার্থক্যহীন সমতার উপর। সুতরাং তাদের জীবনযাপন ও হবে পার্থক্যহীন সমতার উপর। আর যেহেতু সম্পদ ও নারী হলো এমন দুটি উপকরণ যার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা মানব স্বভাবের চাহিদার অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু এ দুটি ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে সাম্য ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।” শাহরাস্তানী বলেন—

 

তিনি নারী ও সম্পদের মালিকানা অবাধ করে দেন এবং আগুন পানী ও ঘাসের মতো নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রে সমমালিকানা ঘোষণা করেন। যুবসমাজ ও ভোগবাদী শ্রেণীর মধ্যে এ আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কারণ এটা ছিল তাদের ভোগলিপ্সা ও কামপ্রবৃত্তি পূর্ণ অনুকূল। আরো চমকপ্রদ বিষয় এই যে এ আন্দোলন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও লাভ করেছিল। তাবারী বলেন—বিকৃত রুচির ইতর লোকেরা এ সুযোগ লুফে নিয়ে মাযদাকিদের দলে ভিড়ে গেল। তারা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠল যে সাধারণ মানুষ হয়ে পড়লো তাদের ভোগলিপ্সা ও কামলালসার অসহায় শিকার। দিনেদুপুরে ঘরে ঘরে হানা দিয়ে মানুষের মান ও ‘সামান’ তারা ভোগ দখলে নিয়ে নিত। গৃহস্বামীর কিছুই করার থাকত না। কিন্তু যখন এটা সমাজে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে তখন পরিস্থিতি এত দূর গড়ি যায় যে, সমাজের পিতৃপরিচয় বিলুপ্ত হয়ে গেল এবং বস্তুর উপর ব্যক্তিমালিকানা রহিত হয়ে গেল [২] 

 

আজকের পশ্চিমা বিশ্বে আমরা এই পিতৃপরিচয়হীনতার নোংরা ও ঘৃণ্য পরিস্থিতি লক্ষ্য করছি। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী: “বিবাহবহির্ভুত সন্তান জন্মদানে ইউরোপের দেশগুলোতে শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটিতে ১০০ শিশুর মধ্যে ৬০ জনের বাবা-মা বিয়ে ছাড়াই তাদের সন্তান জন্ম দেন।”

 

“২০১৮ সালে ইউরোপে বিবাহবহির্ভূত সন্তান জন্ম দেয়ার হার দাঁড়ায় ৪২ শতাংশ। ২০০০ সালে এ হার ছিল ২৫ শতাংশ। গেলো ১৮ বছরে বিয়ে ছাড়া সন্তান জন্ম দেয়ার হার বেড়েছে ১৭ শতাংশ। বর্তমানে ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে জন্ম গ্রহণ করা শতকরা ৪২টি শিশুর বাবা-মা বিয়ে ছাড়া সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। ইউরোপের ২৬টি দেশের মধ্যে জরিপটি পরিচালনা করা হয়।”

 

“ফ্রান্সের পরই আছে বেলজিয়াম। সেখানে ৫৮ দশমিক ৫ দশমিক শিশুর মা-বাবা পরস্পর স্বামী-স্ত্রী নয়। স্লোভেনিয়া ও পর্তুগালে এ হার ৫৭ দশমিক ৭ এবং ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ।”

 

“সুইডেন, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, নেদারল্যান্ডসেও এ হার ৫০ শতাংশের উপরে। বেলজিয়াম, চেচনিয়া স্পেন, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ৪০ শতাংশের বেশি। এ তালিকায় ১৯ নম্বরে ইতালি। দেশটিতে ৩৪ শতাংশ শিশুদের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী নয়। জার্মানিতে এ হার ৩৩ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী ইউরোপে দেশটির অবস্থান ২০ নম্বরে।”

 

“ইউরোপের আরেক দেশ রোমানিয়া এ হার ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ। লিথুনিয়া, পোল্যান্ড, ক্রোশিয়া, সাইপ্রাসে জন্মগ্রহণকারী ২০ শতাংশের বেশি শিশুর বাবা-মা, স্বামী স্ত্রী নয়। গ্রিসে এ হার সবচেয়ে কম। মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ।”[৩] 

 

একটা সমাজ যখন নির্লজ্জতা ও অসভ্যতার চূড়ান্ত অতিক্রম করে, তখনো হয়তো তাদের কাছে এমনটা সম্ভব না; যেমনটা আমরা এই যুগে অবলোকন করছি। এইতো কিছুদিন আগেই মাওলানা তারিক জামিল সাহেবের বয়ানে শুনছিলাম চেঙ্গিস খানের কথা। তিনি বললেন: চেঙ্গিস খান ও তার জাতির এই আকস্মিক ও অভাবনীয় সাফল্য ও বিদ্যুৎ গতিতে একের পর এক রাজ্য জয়ের কারণে হচ্ছে তাদের যৌন নিয়ন্ত্রণের কঠিন প্রশিক্ষণ। তাদের নিজস্ব ধর্ম শাস্ত্র চেঙ্গিস খান নিজে প্রণয়ন করেছিলেন, আর তাতে জিনা-ব্যভিচারের শাস্তি লেখা হয়েছিলো মৃত্যুদণ্ড। এটা ছিল তাতারি গোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক নীতি। ভাবতে পারেন একজন অমুসলিম যে কিনা সূর্যের পূজা করত, তার কাছে এই বিষয়টার এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন? সে আসলে বুঝতে পেরেছিলো যেই জাতি নিজেদের মধ্যকার পশুবৃত্তি ও যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তারা কখনোই অন্য আরেকটা জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এটাই হচ্ছে ইতিহাস ও সভ্যতার মূল নীতি। যদিও তাতারিদের যুদ্ধ পরবর্তী ধ্বংস, হত্যাযজ্ঞ, নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন, শিশুহত্যা ও পাশবিকতা ইতিহাসে নজিরবিহীন।

 

সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলোজিস্ট জন ডেনিয়েল আনউইন ৫০০০ ইতিহাস ঘেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র এবং ছয়টি সভ্যতার উপর এক পর্যালোনা করেন। আনউইন এ গবেষণা শুরু করেন সভ্যতাকে অবদমিত কামনা-বাসনার ফসল হিসাবে দাবী করা ফ্রয়েডির থিওরি যাচাই করার জন্য। কিন্তু ফলাফল দেখে হচকচিয়ে যান আনউইন নিজেই। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত sex & culture বইতে দীর্ঘ এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন তিনি। বিভিন্ন সভ্যতা ও সেগুলোর পতনে আনউইন দেখতে পান একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন—

 

কোন সভ্যতার বিকাশ এই সভ্যতার যৌনসংযমের সাথে সম্পর্কিত। যৌনতার ব্যাপারে কোন সমাজ যত বেশি সংযমী হবে তত বৃদ্ধি পাবে বিকাশ ও অগ্রগতির হার। সহজ ভাষায় বললে, সভ্যতার বিকাশের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মে বাধা স্বাভাবিক যৌনাচার আবশ্যিক। প্রাথমিক বিকাশের পর্যায় যৌনাচারের ক্ষেত্রে প্রতিটি সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি থাকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং এর ভিত্তি পারস্পারিক বিশ্বস্ততা।[৪] 

 

যেকোন সভ্যতা তার বিকাশ অগ্রগতি উন্নয়ন ও উত্থানের প্রাথমিক সময়ে সামাজিক নিয়ম-কানুন, আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি সাংস্কৃতিক প্রথা-পদ্ধতির বিষয়ে থাকে অত্যন্ত কঠোর সুশৃংখল ও সুনিয়ন্ত্রিত। সুমেরীয়, গ্রীক, ব্যাবিলন এংলো সেকশন সহ প্রত্যেকটি সভ্যতার ক্ষেত্রে একই কথা। কিন্তু যখন উন্নয়নশীল এই সভ্যতা গুলো নিজেদের সাফল্যে পৌঁছে যায়, তখন বিলাসবহুল জীবন যাপন তাদের চাহিদা ও ভোগ লিপ্সাকে আর পূর্বের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আস্তে আস্তে তারা অবৈধ যৌনাচারকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসে। মহামারির মত তখন সমাজে অবৈধ যৌনাচার ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুরু হয় বহুগামিতা, সমকামিতা, উভকামীতার মতো ব্যাপারগুলো। মানুষ তখন সামষ্টিক কল্যাণ এর উপর নিজের ব্যক্তিগত ও হীন আনন্দকে প্রশ্রয় দেয়।

 

আনউইন উপসংহার টানেন, বিয়ে পূর্ববর্তী ও বিয়ে বহির্ভূত যৌনতা এবং অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার যে সমাজে যত বেশি সে সমাজের সামাজিক শক্তি তত কম। যৌনতার উপর যে সমাজ যত বেশি বাধানিষেধ আরোপ করে তার সামরিক শক্তি তত বাড়ে। এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সমাজ হলো যেখানে যৌনতা এক বিয়েকেন্দ্রিক পরিবারের ( Heterosexual Monogamy) মধ্যে সীমাবদ্ধ। আনউইনের মতে ৫০০০ বছরের ইতিহাসজুড়ে, প্রতিটি সভ্যতা ও সমাজের ক্ষেত্রে এ কথা সত্য।[৫]

 

যেকোনো সমাজকে সামাজিক শক্তি অথবা যৌন স্বাধীনতার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। আর এর পক্ষে প্রমাণ হলো কোন সময় এক প্রজন্মের বেশি এ দুটো একসাথে চালিয়ে যেতে পারে না। [৬] 

 

তাহলে বুঝা গেল সমাজ সভ্যতা, উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সুষ্ঠু পারিবারিক সমাজ ব্যবস্থা। মূলত এটাই হচ্ছে একটা সভ্যতা বিকাশের মূল সূতিকাগার ও কারখানা। একজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে তখনই মানুষত্ব ও নৈতিক বিবেচনাবোধ ও সমাজিকতার মূল মন্ত্র নিয়ে গড়ে উঠতে পারে একটা সুশীল পরিবার ব্যবস্থায়। যেটা একমাত্র সর্বতোভাবে ইসলামই দিতে পারে। কেননা ইসলামের ১৩০০ বছরের বিশ্ব শাসনের ইতিহাস এর সর্বোচ্চ প্রমাণ ও স্বীকৃত বিষয়। ইসলামী সভ্যতা পৃথিবীর মধ্যে এমন ভ্রাতৃত্ববোধ, সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত পারিবারিক সমাজ ব্যবস্থা, নীতি-নৈতিকতা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা, ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের যেই দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা উপস্থাপন করেছে, তার সমকক্ষ একটা উদাহরণও আজকের এই পৃথিবী দেখাতে পারেনি এবং পারবেও না। কারণ ইসলামই একমাত্র ধর্ম ও সভ্যতা, যা তার আদর্শ ও সভ্যতা সংস্কৃতির অগ্রগতির জন্য এমন এক স্বাভাবিক যৌনাচার আবশ্যিক করেছে যা ইসলামকে অধিষ্ঠিত করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যাবস্থা হিসেবে। তাদের শক্তিশালী ও দৃঢ় সংকল্পিত ঈমান ও সুসংগঠিত পারিবারিক ব্যাবস্থা তাদের দিয়ে ছিলো এমন ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি যে, কায়সারের মুকুট মুসলমানদের পায়ের নীচে পদদলিত হচ্ছিলো।

 

বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তি লেখক সাইয়েদ কুতুব শহীদ রহ. বলেন: সভ্যতা, সামাজিকতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিকাশের ক্ষেত্রে পারিবারিক সংস্থাটির গুরুত্ব অপরিসীম। এই সংস্থাটির উপরে নির্ভর করে সমাজের আগামী দিনের সদস্যদের গুণগত মান। সুতরাং পরিবারকে সমাজের প্রথম শিক্ষালয় নিরূপণ করা, স্বামী ও স্ত্রীর উপর তাদের নিজ নিজ যোগ্যতা ও প্রকৃতি অনুসারে দায়িত্ব বণ্টনের ব্যবস্থা করা এবং অনাগত ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিক অর্থে মানুষ করে গড়ে তোলাকে পরিবারের প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা কোন সমাজকে ‘সভ্য’ দাবি করার পূর্বশর্ত। আর একথা অনস্বীকার্য যে, একমাত্র ইসলামই জীবন ব্যবস্থাই এই শর্ত পূরণ করার সাথে সাথে পরিবার নামক সংস্থাটি কে সুসংহত করার জন্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। [৭]

 

বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, একটা সমাজ সভ্যতা উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা যুবকদের। পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রমাণিত এবং সর্বজন স্বীকৃত বিষয়। যেই সমাজের যুবকরা তাদের যৌবনকে যতবেশি শৃংখল মণ্ডিত করে সেই জাতি ও সমাজ উন্নয়ন,অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দিক থেকে অন্যান্য সমাজ সভ্যতা, জাতির ও গোত্রের তূলনায় দ্রততর সমৃদ্ধি ও ক্ষমতার মালিক হয়! এজন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন। হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সাওম পালন করে। কেননা, সাওম তার যৌনতাকে দমন করবে। [৮]

 

আজকের পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থার দুরাবস্থা ও দুর্গতির জন্য একমাত্র দায়ী তাদের ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থা, অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার। বাস্তবতা হচ্ছে তাদের সমাজ এখন আর পিতৃ পরিচয়ের উপর নির্ভর করে না। ছেলে সন্তান জানেনা তার বাবা কে? এমনকি মা নিজেও জানেনা এই ছেলে সন্তানের জন্মদাতা কে! এভাবেই চলছে পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থার নিম্নমুখী প্রতিক্রিয়াশীল দ্রুতগামী পতন। সমাজ-সভ্যতা জাতি, দেশের উন্নয়নের জন্য একটা সুসংহত, সুপরিকল্পিত,সামাজিক ও পারিবারিক ব্যাবস্থা জরুরি। এবং সেখান থেকে সকল ধরনের চারিত্রিক পদস্খলনের উপায়-উপকরণ ধ্বংস করা আবশ্যক। যতক্ষণ পর্যন্ত না এই বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই সমাজ ব্যবস্থার উন্নতি অগ্রগতি একটা কাল্পনিক স্বপ্ন বিলাস মাত্র। যিনা-ব্যভিচার মদ্যপান অধিক বিলাসবহুল জীবনযাপন একটা সমাজ ব্যবস্থা ধসে পড়ার জন্য দায়ী। নৈতিক পদস্খলন থেকেই মানুষ প্রকৃতপক্ষে যিনা-ব্যভিচার ও মদ্যপানের দিকে পশুসুলভ মনোভাব নিয়ে ঝুঁকে পড়ে। এজন্যই আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে আমাদের জন্য ইরশাদ করেন: ( ব্যভিচার তো দূরে থাক আমরা যেন তার নিকটবর্তী না হই)

 

وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا ﴿۳۲﴾

“আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।”[৯]

 

আল্লাহ তায়ালার শুধু আমাদেরকে আদেশ দিয়ে ক্ষান্ত হননি বরং তিনি জানতেন মানব স্বভাবে মানুষ পদস্খলিত হবেই এবং যদি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না করা হয় তাহলে মানুষকে এই কাজে নিষেধাজ্ঞা সত্বেও তারা এই কাজটি বারংবার এবং বার বার করতেই থাকবে। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেন:

 

اَلزَّانِیَۃُ وَ الزَّانِیۡ فَاجۡلِدُوۡا کُلَّ وَاحِدٍ مِّنۡہُمَا مِائَۃَ جَلۡدَۃٍ ۪ وَّ لَا تَاۡخُذۡکُمۡ بِہِمَا رَاۡفَۃٌ فِیۡ دِیۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۚ وَ لۡیَشۡہَدۡ عَذَابَہُمَا طَآئِفَۃٌ مِّنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ﴿۲﴾

 

“ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশ’টি করে বেত্রাঘাত কর। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক তবে আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।”[১০]

 

যারা মনে করে আধুনিকতা উন্নয়ন ও অগ্রগতির মাপকাঠি হচ্ছে অবাধ যৌনতা, তারা আসলে পতিতালয়ের তথাকথিত সুশীল সমাজের অসভ্য লোকদের ঘামঝড়া কষ্টের ফসল কিংবা পশ্চিমাদের সুবিধাবাদী মনোভাবের মগজ ধোলাইয়ের আদর্শিক উদাহরণ। আসলে ব্যাপারটা হয়েছে এমন যে, ধ্বংসশীল ও ক্ষয়িষ্ণু সামাজিকতা ও সভ্যতার পরিবেশ পরিস্থিতি এমন এক উদ্ভট দুর্গন্ধযুক্ত কু-শ্রী আবহাওয়া তৈরি করেছে যে, এখানকার মানুষ এখন বিদ্যমান বেহায়াপনা, নোংরামি, বেলেল্লাপনা ও নারীর দেহ প্রদর্শনকেই স্বাভাবিক ও নৈতিক বিচারের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এজন্যই আজকে তাদের ব্যাক্তি জীবনে দুঃখ-দুর্দশা একাকিত্বের প্রাবল্যে মানুষ আত্মহত্যা করছে।

 

“যে সমাজ অবাধ যৌনতা কে বৈধতা দেয়া হয়, অবৈধ সন্তানের যে সমাজ ভরে যায়, নিছক পশুসূলভ যৌন-ক্ষুধা মেটানোকে যে সমাজে নারী পুরুষের সম্পর্কের উদ্দেশ্য মনে করা হয়, সে সমাজ কিছুতেই মানুষের সমাজ হতে পারে না। বরং তা পশুর সমাজ।”

 

এবং এটাই চিরায়ত সত্য যে, যেই সমাজ- সভ্যতা যৌনতাকে যতবেশি শৃংখল মণ্ডিত করবে, তাদের উন্নতি অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে থাকবে। প্রত্যেকটা সভ্যতার প্রাথমিক ইতিহাস অন্ততপক্ষে এই দিকটাই আমাদের কাছে প্রকাশিত করে এবং সেই সভ্যতার পতন ও ধ্বংসের জন্যেও ইতিহাস তাদের অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। এর থেকে এটা প্রমাণিত যে, সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও মানবতা ও মানব সভ্যতার বিকাশ ও অগ্রগতির জন্য বিয়েকেন্দ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ স্বাভাবিক যৌনতার বিকল্প নেই!

– হাসান মুহাম্মাদ আরিফ

ফুটনোট

[১] সূরা আল ইমরান:১৪০

[২] মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কি ক্ষতি হলো?

[৩] বিয়ে ছাড়া সন্তান জন্মদানে শীর্ষ চার দেশ। ফাইয়াজ আহমেদ, সময় নিউজ। ২৪, জুলাই ২০২০

[৪] চিন্তাপরাধ: ১৫১

[৫] প্রাগুক্ত: ১৫২

[৬] sex & culture/ চিন্তাপরাধ।

[৭] আগামী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র: ১১৮

[৮] সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫০৬৬

[৯] সূরা বনী ইসরাইল। আয়াত ৩২

[১০] সূরা নূর। আয়াত:২

[১১] আগামী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র: ১১৮

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন