ইউরোপের রানি আঙ্গেলা মের্কেলের ভাঙা মুকুট কাতিয়া এ্যাডলার

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৪, সেপ্টেম্বর, ২০২১, মঙ্গলবার
ইউরোপের রানি আঙ্গেলা মের্কেলের ভাঙা মুকুট কাতিয়া এ্যাডলার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আঙ্গেলা মের্কেলের নাম দেয়া হয়েছিল ইউরোপের রানি। কিন্তু জার্মানির এই ক্ষমতাধর চ্যান্সেলর আগামী ২৬শে সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের পরই বিদায় নিচ্ছেন।

 

অনেক আগেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি আর চ্যান্সেলর পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। তবে তার এই বিদায় কি রানির মত বিদায়ই হবে? অনেকেই এখন আর অতটা নিশ্চিত নন।

 

এটা সত্য যে আঙ্গেলা মের্কেল হচ্ছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বর্তমান নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে নেতৃত্বের পদে আছেন।

 

তিনি প্রায় ১০০টি ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন, মাঝে মাঝে তাকে বলা হতো – আঙ্গেলা মের্কেলই সম্মেলন কক্ষের একমাত্র বয়স্ক ব্যক্তি।

 

ইইউকে বহু সংকট পার হতে সহায়তা করেছেন তিনি। অভিবাসন সংকট, ইউরো সংকট, কোভিড-১৯, এমনকি কিছুটা ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রেও।

 

কিন্তু আঙ্গেলা মের্কেলের রাজনৈতিক জীবন আসলে দু’ভাগে বিভক্ত।

 

ইউরোপের নেতা হিসেবে যেমন, তেমনি জার্মানির নেতা হিসেবেও তার উত্তরাধিকার আসলে ভালো-মন্দ মিলিয়ে।

 

জার্মানিতে মিসেস মের্কেলের সমালোচনা হয় এই জন্যে যে গত ১৬ বছরের শাসনকালে তিনি ছিলেন একজন ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ – সংকট সামাল দেবার জন্য তিনি অপেক্ষা করতে করতে একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। বলা হয়, তিনি একজন বাস্তববাদী, কিন্তু দ্রষ্টা নন।

 

এই সমালোচকরা বলেন, ইউরোপের নেত্রী হিসেবেও তিনি এই একইভাবে কাজ করেছেন।

 

বলা যায়, আঙ্গেলা মের্কেল যা করেছেন তার অভিঘাত – তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবার পরও বহুদিন অনুভূত হবে।

 

ইইউর ক্রাইসিস ম্যানেজার

আঙ্গেলা মের্কেলের বাস্তববুদ্ধি অনেক সময় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে বহু সংকট পার হয়ে আসতে সহায়তা করেছে – যা কখনো কখনো ইইউর অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারতো।

 

কিন্তু অনেকে পাল্টা যুক্তি দেন, তার দূরদর্শিতার অভাব এই ইউনিয়নকে আগের চাইতে দুর্বলতর এবং দিকনির্দেশনাহীন করে ফেলেছে।

এটা হতো না – যদি ইইউর সবচেয়ে ধনী এবং প্রভাবশালী দেশের নেতা হিসেবে আঙ্গেলা মের্কেল তার অবস্থানকে আরো জোরের সাথে কাজে লাগাতেন।

 

ধরা যাক ২০১৫ সালের ইউরোজোনের সংকটের কথা।

 

এমনকি গ্রিসের ক্ষ্যাপা অর্থমন্ত্রী ইয়ানিম ভারুফাকিসও স্বীকার করেন, তার দেশের আর্থিক দুরবস্থা সত্বেও গ্রিসকে ইউরোজোনের ভেতরে রেখে মিসেস মের্কেল আসলে ইউরো মুদ্রাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

 

তিনি বলেন, “এটা সত্যি যে শেষ পর্যন্ত আঙ্গেলা মের্কেলের জন্যই ইউরোজোন টিকে গেছে – কারণ গ্রিস যদি এখান থেকে বেরিয়ে যেতো তাহলে ইউরোজোনকে একসাথে রাখা সম্ভব হতো বলে আমি বিশ্বাস করি না। ”

 

“কিন্তু যে নীতি তিনি অনুসরণ করেছেন তা নিয়ে আমার গুরুতর ভিন্নমত আছে। ইউরোজোন নিয়ে, বা একে রক্ষা করার পর এটাকে নিয়ে কি করতে হবে – তার ব্যাপারে তার কোন রূপকল্প ছিল না। তিনি যেভাবে এটাকে রক্ষা করেছেন তা জার্মানির ভেতরে এবং গ্রিসের ভেতরেও অনেক বিভক্তি সৃষ্টি করেছে।”

 

মি. ভারুফাকিস এসময় গ্রিসের কৃচ্ছসাধনের কর্মসূচির উদ্ধৃতি দিলেন, যা চাপিয়ে দেবার পেছনে জার্মানিরই প্রধান ভুমিকা ছিল।

 

দু’হাজার পনের সালে আমি অ্যাথেন্সে ছিলাম। সেসময় আমি দেখেছি সেখানকার রাস্তায় জার্মানি-বিরোধী, ইইউ-বিরোধী বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীদের হাতে যে প্ল্যাকার্ড ছিল – তাতে আঙ্গেলা মের্কেলের ছবিতে হিটলারের গোঁফ বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। অন্য অনেকে ইইউর পতাকা পুড়িয়েছিলেন।

 

সবার আগে জার্মানি?

অর্থনৈতিক কৃচ্ছতার কর্মসূচি চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল স্পেন আর ইতালির ওপরও ।

 

এ দেশগুলোর করদাতাদের অনেকের মতে – এ কর্মসূচি ছিল অতি কঠোর, এবং তাদের বিশ্বাস ছিল এটা চাপিয়ে দেবার পেছনে ছিলেন আঙ্গেলা মের্কেলই ।

 

এর ফলে একসময়কার ইউরো-প্রেমিক ইতালিতে ইইউ-এর ব্যাপারে সন্দেহ জোরালো হয়ে ওঠে।

 

ক্রুদ্ধ ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়, ইউরোজোনের নীতিমালাগুলো তৈরিই হয়েছে ক্ষমতাধর জার্মানির স্বার্থ রক্ষা করতে, তাদের রপ্তানি শিল্পকে আনুকুল্য দিতে।

এরা প্রশ্ন তোলেন, জার্মানির মত ক্ষমতাধর ও ধনী সদস্যরা যদি দুর্বলতর দেশগুলোকে সাহায্য না করে তাহলে ইইউতে বা কমন মার্কেটে থাকার দরকার কি?

 

কিছু সমালোচক আছেন যারা মনে করেন, ইউরোপে আঙ্গেলা মের্কেলের আসল নীতি হচ্ছে ‘সবার আগে জার্মানির স্বার্থ’ দেখা।

 

অনেকে হয়তো বলবেন, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ একজন নির্বাচিত নেতা তো তার দেশের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবেন। তবে অন্য একটা কারণ আছে – যা জার্মানির একান্ত নিজের একটি সমস্যা।

 

সেটা হলো জার্মানির নাৎসী অতীত।

 

জার্মানরা, এবং জার্মান চ্যান্সেলররাও – এ কারণে প্রায়ই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চোখে পড়ার মত প্রধান নেতৃত্বের ভুমিকা নিতে অস্বস্তি বোধ করেন।

 

‘গেম চেঞ্জার’ আঙ্গেলা মের্কেল

 

তাহলে প্রশ্ন ওঠে – আঙ্গেলা মের্কেলকে যে ইউরোপের রানি বলা হয় – ব্যাপারটা কি আসলে সেরকমই?

 

ইউরোজোনকে রক্ষা করতে চ্যান্সেলর মের্কেল হস্তক্ষেপ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার ফলে তিনি ইইউর ভেতরে একটা গভীর উত্তর-দক্ষিণ বিভক্তিও উস্কে দিয়েছিলেন।

 

এর পরবর্তীকালে অভিবাসন সংকটের সময়, এবং কোভিড মহামারির সময়ও এ বিভক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।

 

ইউরোপের দক্ষিণের দেশগুলোর মানুষ মনে করেছিলেন – এইসব জরুরি পরিস্থিতির দুর্ভোগ তাদেরকেই বহন করতে হয়েছে, ইইউর অন্যদেশগুলো তাদের খবর নেয়নি।

 

কিন্তু এ অবস্থা বেশিদিন চলেনি। অনেকটা দেরিতে হলেও গঠিত হয় কোভিড-সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি তহবিল – যাতে সেই আঙ্গেলা মের্কেলই এক প্রধান ভুমিকা রেখেছিলেন।

 

ইইউর কোভিড রিকভারি ফান্ডের অন্যতম প্রণেতা ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লা মেয়ার বলেন, চ্যান্সেলার মের্কেল এক্ষেত্রে সাহস দেখিয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এবং বুঝেছিলেন – ওই তহবিলে জার্মানি যোগ না দিলে ইইউর ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে।

অনেকে আবার এটিকে এভাবেও দেখেন যে – আঙ্গেলা মের্কেল এ ক্ষেত্রেও আসলে জার্মানির স্বার্থই দেখেছিলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে মহামারির কারণে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স বা অন্য দেশগুলো যদি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয় – তাহলে ইউরোপের একক বাজারই শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়বে। আর সেই বাজার ভেঙে পড়লে জার্মানির ব্যবসাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 

অভিবাসন সংকটের সময় অবশ্য তার পদক্ষেপগুলো অতটা প্রশংসিত হয়নি।

 

আঙ্গেলা মের্কেলের’মিশ্র’ মানবাধিকার রেকর্ড

 

আঙ্গেলা মের্কেল যখন ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে জার্মানির সীমান্ত খুলে দিয়ে ১০ লক্ষেরও বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীকে সেদেশে ঢুকতে দিলেন – তখন তিনি প্রশংসিত ও নিন্দিত দুটোই হয়েছিলেন।

 

জার্মানির মানুষের একাংশ অন্যদের স্বাগত জানানোর সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য মিসেস মের্কেলের প্রশংসা করেন।

 

কিন্তু অন্যরা এত অভিবাসীর আগমন দেখে ক্ষিপ্ত হন। তারা দলে দলে যোগ দেন উগ্র-দক্ষিণপন্থী এএফডি-র সাথে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মত ফেডারেল পার্লামেন্টে কোন উগ্র-দক্ষিণপন্থী দল আসন জিততে সক্ষম হয়।

 

ইইউ-র ওপর এর প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপক ও মিশ্র।

 

ইইউ ২০১২ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিল, কিন্তু তার মাত্র তিন বছর পরই এর সদস্য দেশগুলো সিরিয়াসহ নানা দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের ঠেকাতে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিতে থাকে।

 

তবে জার্মান নেতার পদক্ষেপের ফলে মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে ইইউর যে সুনাম ছিল তা পুনরুজ্জীবিত হয়।

 

এতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও, বলছেন বেন রোডস – প্রেসিডেন্টের ডান হাত এবং তার ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।

মি. রোডসের মতে, মি. ওবামা আঙ্গেলা মের্কেলকে উৎসাহিত করেন ইউরোপের পক্ষে আরো জোরালো অবস্থান নিতে – বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় আর ব্রেক্সিট ভোটের পর। তিনি আরো এক মেয়াদ চ্যান্সেলর থাকতেও তাকে চাপ দেন।

 

মি. রোডস বলছিলেন, ২০১৬ সালের শেষ দিকে ওবামার মনে হয়েছিল যে আঙ্গেলা মের্কেলের জার্মানিই হতে যাচ্ছে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভরকেন্দ্র।

 

জোরালো পদক্ষেপ না নেয়া

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন যে সিরিয়া ও লিবিয়ার ঘটনাবলীর পর ২০১৫ সালেই আঙ্গেলা মের্কেল আইনানুগ ও সুশৃংখলভাবে অভিবাসনের জন্য ইইউ নেতাদের চাপ দিতে পারতেন।

 

কিন্তু বেপরোয়া অভিবাসীরা যখন অবৈধ পথে ইউরোপে আসতে গিয়ে সাগরে ডুবে মারা যেতে লাগলো – ইউরোপের দেশগুলো তখন তাদের সেখানে ঢুকতে না দেবার চেষ্টায় ছিল।

 

ইউরোপে শরণার্থীদের আসা ঠেকানোর জন্য পরে আঙ্গেলা মের্কেল যখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোয়ানের সাথে একটি বিতর্কিত চুক্তি করলেন, তখন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও শরণার্থী সংস্থাগুলোও তার কড়া সমালোচনা করে।

 

হাঙ্গেরিতে একটি নতুন আইন করার পর আঙ্গেলা মের্কেল এবং আরো ১৬ জন ইইউ নেতা সমকামীদের সমর্থনে একটি যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু অনেকে মনে করেন, আঙ্গেলা মের্কেলের প্রশ্রয় পেয়েই হাঙ্গেরির “অনুদার” প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান সেদেশের গণতন্ত্রকে পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

এ ধারণার কারণ হলো, মি. অরবান কিছুকাল আগে পর্যন্তও ব্রাসেলসের রাজনীতিতে আঙ্গেলা মের্কেলের মধ্য-দক্ষিণপন্থী ইপিপি গ্রুপের সদস্য ছিলেন। এই জোটের কারণে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে তাদের সদস্যসংখ্যা ও প্রভাব নিশ্চিত ছিল।

তাই ভিক্টর অরবানকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে মিসেস মের্কেলের সমস্যা ছিল, এবং তিনি অনেকবার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়েও নেননি।

 

হাঙ্গেরি ও তার মিত্র পোল্যান্ড এ থেকে বুঝতে পেরেছে যে – আঙ্গেলা মের্কেল এবং সামগ্রিকভাবে ইইউ – তাদের আইনের শাসন বা মানবাধিকার সম্পর্কে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চায় না, বা পারে না।

 

অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার

সাবেক স্প্যানিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনা পালাসিও মনে করেন, যদি জার্মানি চাইতো – তাহলে উদার গণতন্ত্রী নয় এমন দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে উর্ধে তুলে ধরার জন্য পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হতো।

 

তুরস্কের সাথে চুক্তি থেকে শুরু করে চীনের সাথে একটি বিনিয়োগ চুক্তির মতো “সন্দেহজনক সিদ্ধান্তের” জন্যও আঙ্গেলা মের্কেলকে দায়ী করেন আনা পালাসিও। এ চুক্তির জন্য বাইডেন প্রশাসনও নাখোশ হয়।

 

২০২০ সালে চীন ছিল জার্মানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার।

 

আঙ্গেলা মের্কেলের বিরুদ্ধে প্রায়ই একটা সমালোচনা হয় – তা হলো, তিনি জার্মানির পররাষ্ট্রনীতিকে বাণিজ্যিক স্বার্থ দিয়ে পরিচালিত হতে দেন – যার প্রভাব পড়ে ইইউর ওপর।

 

এর একটা দৃষ্টান্ত – রাশিয়ার সাথে নর্ডস্ট্রিম-টু গ্যাস পাইপলাইন করে জার্মানি সস্তায় জ্বালানি পাবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এতে আঙ্গেলা মের্কেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তিনি ইইউর রাজনৈতিক ঐক্য এবং রাশিয়ার ব্যাপার কৌশলগত সংহতিকে দুর্বল করেছেন, এবং ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে ইইউকে দুর্বল করার আরো একটি হাতিয়ার তুলে দিয়েছেন।

 

ইউক্রেন সহ মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশই এ পাইপলাইনের বিরোধী।

 

তবে আঙ্গেলা মের্কেল বলছেন, রাশিয়া যদি এ পাইপলাইনের অপব্যবহার করে তাহলে ইইউ তাদের ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে।

অন্যদিকে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে আঙ্গেলা মের্কেল সবসময়ই রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে ছিলেন। রুশ সরকারবিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির ওপর বিষপ্রয়োগের ঘটনার পর তিনি জার্মানিতে মি. নাভালনির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন, একবার তার সাথে সাক্ষাতও করেছেন যা খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।

 

সুতরাং সব মিলিয়ে তার রেকর্ডকে মিশ্রই বলতে হবে।

 

মিশ্র উত্তরাধিকার

এই লেখা অবশ্যই ইইউর সব সমস্যার জন্য আঙ্গেলা মের্কেলকে দায়ী করার জন্য নয়।

 

কিন্তু ইইউর উত্তরাধিকারের কথা বলতে গেলে তার রাজনৈতিক গুরু সাবেক চ্যান্সেলর হেলমুট কোহলের দিকে তাকাতে হয়। ব্রাসেলসে তাকে মানা হয় আধুনিক ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা পিতা হিসেবে।

 

তিনি জার্মানির পুনরেকত্রীকরণের জন্য কাজ করেছেন, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপকে ইইউর অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন – এমন এক সময় যখন তাদের ইইউর সদস্য করার কথা ওঠেনি। তিনি তখনকার জার্মানির জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে অভিন্ন মুদ্রা ইউরোর পক্ষে ছিলেন। কোহল মনে করতেন এতে ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের মধ্যে যুদ্ধ রোধ করবে।

তার সাথে তুলনা করলে বলতে হয়, আঙ্গেলা মের্কেলের মাথায় ইউরোপের রানির মুকুট যেন ঠিকমত বসতে চায় না।

 

তিনি কি ইউরোপের এক সংকটকালে দেশগুলোকে একসাথে রাখতে একটা আঠার মত কাজ করেছে? উত্তর হবে – হ্যাঁ।

 

কিন্তু তিনি কি ইইউর আত্মবিশ্বাসী নতুন ভবিষ্যতের স্থপতি? বোধ হয় না।

 

মের্কেলে-পরবর্তী ইইউ

 

এই খেতাব পেতে চান ফ্রান্সের ইম্মানুয়েল ম্যাক্রঁ ।

 

ইইউর সংস্কারের জন্য তার একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা আছে। তিনি চান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৌশলগত স্বায়ত্বশাসন – অন্ততপক্ষে মার্কিন-নির্ভরতা কমাতে।

 

কিন্তু ইউরোপের ফ্রাংকো-জার্মান চালিকাশক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ২১ শতকের ইইউ রূপকল্পকে বাস্তবায়নের জন্য তার দরকার জার্মানির আর্থিক সহযোগিতা – যা এতদিন আঙ্গেলা মের্কেল নানাভাবে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, কোভিড-সংকট কাটিয়ে ওঠার তহবিল গঠনের আগে পর্যন্ত।

 

ফরাসী প্রেসিডেন্টের প্রশাসন থেকে ইউরোপের জন্য বহু আইডিয়া আসে। ইউরোপের নিজের প্রতিরক্ষা বাহিনী, পরিবেশসংক্রান্ত প্রস্তাব, ইইউর জন্য নতুন বাণিজ্যনীতি, এবং ইউরো মুদ্রাকে সংহত করা – নানা রকম প্রস্তাব।

 

এজন্য বার্লিনে মি. ম্যাক্রঁর প্রশাসনের নাম হয়েছে স্ক্যাটারগান।

 

এ মাসের নির্বাচনের পর জার্মানির পরবর্তী চ্যান্সেলর কে হবেন তা এখনো বলা যাচ্ছে না- কিন্তু যিনিই হোন, তার যে ব্রাসেলসে আঙ্গেলা মের্কেলের অভিজ্ঞতা বা প্রভাব থাকবে না এটা বলাই যায়।

 

মি. ম্যাক্র মের্কেলের শূন্যস্থান পূরণ করতে চান। ফ্রান্সে যাকে এলিসে প্রাসাদের সম্রাট বলা হয়, তিনি চান ইউরোপের রাজা হতে।

 

তিনি তা হতে পারলে হয়তো ইইউতে কিছু বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। কিন্তু তার আগে মি ম্যাক্রঁকে এপ্রিল মাসে ফ্রান্সের নির্বাচন জিততে হবে। সেটা মোটেও সহজ কাজ হবে না।

বিজয়বাংলা/এইচএম/১৪/৯/২০২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন