আপনি, আমিও কি সেই গাদ্দার?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৪, সেপ্টেম্বর, ২০২১, মঙ্গলবার
<strong>আপনি, আমিও কি সেই গাদ্দার?</strong>

জিয়াউল হকঃ ভারতীয় উপমহাদেশ, তথা, ভারতবর্ষের বুকে ইসলাম সামরিক অভিযানের মাধ্যমে, তথা, তলোয়ারের মাধ্যমে এসেছে। এ ধরনের ‘গবেষণালব্ধ এক সত্য’ প্রতিষ্ঠা করতে যুগ যুগ ধরে দেশি বিদেশী বহু গবেষক (!) প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন। দিন রাত পরিশ্রম করে তারা গবেষণা করেছেন। কিন্তু কিছু ‘ত্যাড়া ও মৌলবাদী’ সাহিত্যিক, গবেষক ইতিহাসের গোর খুঁড়ে খুঁড়ে অকাট্য তথ্য প্রমাণ হাজির করে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, না, সেটা সত্য নয়। তাদের এ গবেষণা (!) নিরেট ও নির্জলা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

ভারত তো বটেইম পৃথিবীর অনান্য স্থানের ন্যায় আরও পূর্বদিকে, চীন, শ্রীলংকা, জাভা, বালি, ইন্দোনেশিয়ার নানা উপকূলীয় এলাকাজুড়ে মুসলিম আরব বণিকদের সততা, ব্যক্তিগত জীবানচার, আচরণ আর ভালোবাসা’সহ মানবিক মুল্যাবোধের উন্নত রুপে আকৃষ্ঠ হয়ে দলে দলে স্থানীয় মানুষরা মুসলমান হয়েছেন। এর পওে সেই ক্ষুদ্র সমাজ দিনে দিনে বেড়ে উঠেছে, শক্তিশালী হয়েছে, তার মুলে ছিল মদিনা কিংবা দামেশক, কায়রো বা কুফা কিংবা করাচির প্রান্তজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলমানদের কেন্দ্রিয় ঐক্য ও সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্দ্য বন্ধন; উম্মাহ চেতনার উপরে ভিত্তি করে।

আজ বিশ্বমুসলমানদের সার্বিক যে দুরাবস্থা, তাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে যে করুণ ও অপমানকর পরিস্থিতি বিদ্যমান, তার মুলে রয়েছে বক্তি বা গোষ্ঠী মানস হতে সেই উম্মাহ চেতনা লোপ পাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া। কিভাবে তা হারিয়ে গেল? কোন কারণে, কাদের কারণে? ক’দিন ধরে সে বিষয়ে একটু খোঁজ খবর নেবার চেষ্টা করতে যেয়ে আপাতত ভারতীয় উপমহাদেশের বুকে ঐতিহাসিক কিছু চিত্র সামনে এলো। সেই সাথে এলো বড় লজ্জাস্কর কিছু প্রশ্নও।

আপাতত একটা চিত্র উল্লেখ করি। উগ্র হিন্দুবাদী সন্ত্রাসী শিবাজী’র বাহিনীতে মুসলিম সৈনিক ছিল। এমনকি, মুসলমান সেনাপতি ও নৌ কম্যান্ডারও ছিল (সুত্র: মাগল সাম্রাজ্য থেকে ব্রিটিশরাজ ১৫৫৬-১৮১৮ : সুবোধ কুমার মুখোপ্যাধ্যায়, পৃ: ২৬১)। কয়েকজন নৌ কমান্ডারের নামও পাওয়া যায়; যেমন; ইব্রহিম খাঁন, সিদি মিসরি এবং দৌলত খাঁন, কার পার্সোনাল সেক্রেটারির নাম ছিল মোল্লা হায়দার (সুত্র: ঐ, পৃ: ২৬৩)।
জানি সঠিক জবাব দেবার জন্য এখন আর কেউ বেঁচে নেই, কোথাও এ ব্যাপারে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্যও পাওয়া যাবে না। তারপরেও খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে; সম্রাট আওরঙ্গজেব যদি কট্টর সুন্নী মতাদর্শী নিষ্ঠাবান মুসলমান না হয়ে তার পূর্ব পুরুষ সম্রাট আকবরের মতো গোঁজামিল খিঁচুড়ি মার্কা মুসলমান কিংবা সরাসরি মুরতাদ হতেন, তা হলেও কি এই শিয়া মতাদর্শী মোল্লা হায়দার একজন মুসলমান হয়েও আওরঙ্গজেবের ঘোর শত্রু, তার জানি দুশমন চরম মুসলিম ও ইসলাম বিদ্বেষী শিবাজির সেক্রেটারি পদ গ্রহণ করতেন?

মোল্লা হায়দার কিংবা শিবাজির নৌ কমান্ডার ইব্রাহিম খাঁন, সিদি মিসরি এবং দৌলত খাঁন গং কি কোনদিন ভেবে দেখেছিলেন যে, দরবেশ ও জিন্দাপীরখ্যাত বাদশাহ আলমগীর আওরঙ্গজেবের বিরোধি শিবিরে তাদের এই অবস্থান মোগল ভারতের বুকে এবং দাক্ষিণাত্যের মাটিতে আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দিকালব্যাপী সময়কাল ধরে চালানো সামরিক অভিযানগুলোকে নৈতিকভাবে কতোটা দূবর্ল করে দিয়েছিল?

মজার বিষয় হলো, ঐ একই সময়ে শিবাজী অনেক ভারতীয় মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রাণপ্রিয় নেতা; অন্নদাতা, চাকুরিদাতা মনীব! কারণ, সাধারণ মুসলমানদের চোখে ধুলো দেবার জন্যই হোক বা তাদের সাথে প্রতারণার উদ্দেশ্যে হোক, কেলসি’র প্রখ্যাত দরবেশ আউলিয়া শেখ ইয়াকুতের প্রিয় মুরীদ ছিলেন হিন্দু রাজা শিবাজি!

দক্ষিণ ভারতের নানা বন্দর থেকে এবং বিশেষ করে, সুরাট বন্দর থেকে জাহাজে করে মক্কা অভিমুখে হজ্জে যাওয়া যাত্রীদের জাহাজ লুঠ করা এবং হাজিদের হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়া ছিল শিবাজির নিত্যদিনের কাজ। সে কাজেও নীরব, নিশ্চুপ সহযোগী ছিল এইসব নৌ কমান্ডাররা! কোথাও কোথাও তাদেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণেই এ জঘন্য অরাজকতা সংঘটিত হয়েছে! ভাবা যায় বিষয়টা!!

দক্ষিণের রাজ্য কর্নাটকে শের খাঁন লোদির সুন্নী সালতানাতকে শিবাজি ১৬৭৬ সালে উৎখাত করেন, তার সালতানাত, তথা, একটি মুসলিম সালতানাত কেড়ে নেন হিন্দু শাসনে। সেখানে শিবাজির অন্যতম সহযোগী ছিলেন আর এক মুসলিম শাসক কুতুব শাহ! (পৃ: ২৬০)। সুন্নী সালাতানাত উৎখাতে হিন্দু রাজার সহযোগী তথাকথিত শিয়া মুসলমান!

এসব তথ্য জানার পরে একটা প্রশ্ন বার বার মনের কোণে উঁকি দেয়। মুসলমানদের মধ্যে সেই উম্মাহ চেতনা কোথায় হারিয়ে গেল? এরা না এক উম্মাহ, এক প্রাণ, এক দেহ হবার কথা! সারা বিশ্বমুসলমানরা নাকি একটি দেহের ন্যায় হবার কথা! আফ্রিকা কিংবা আমাজনের জঙ্গলে কোন মুসলমান বিপদ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলে জাভার সমুদ্রতটে কিংবা জাফা’র পাহাড়ি পাদদশে অবস্থানরত মুসলমানের তাদের সেই কষ্ট ও বেদনা আঘাত হয়ে লাগার কথা! কোথায় গেল মুসলমানদের মন থেকে উম্মাহর ধারনা? কেন আর কিভাবে তা হারিয়ে যেতে যেতে আজ একেবারেই লুপ্ত হয়ে গেল?

আমাদের আধুনিক জীবনাচার, জীবনবোধ আর জীবনবোধের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে এই প্রশ্নের উত্তর। খুব সহজ কথায় বলি; ধর্মহীন জীবন আর ‘জীবনহীন ধর্ম’ মেনে চলার জন্যই আজ তাদের এ দূরাবস্থা। ইসলাম কোন জীবনহীন, নীর্জ্জিব, প্রাণহীন ধর্ম নয়। আর মুসলমানেরও কোন ধর্মহীন জীবন হতে পারে না।

আপাতত এসব বড় বড় কথা না হয় থাক। একটা মাত্র প্রশ্নের উত্তর নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখি, তা হলেই বুঝবো, আমি কি সত্যিই উম্মাহ চেতনাকে লালন করি? আমি নিজেকেও প্রশ্নটি করছি। অনুগ্রহ করে আপনিও আপনার নিজ সত্তাকে প্রশ্নটি করুন।

নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনি কি দলমত নির্বিশেষে একজন মুসলমান, এমনকি, যে মুসলমান আপনার সাথে মত ও পথের বেলায় দ্বিমত পোষণ করেন, তার’সহ সকল মুসলমানের রক্ত-জীবন-সম্পদ ও সম্মানকে নিজের রক্ত-জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মতোই মর্যাদাকর ভাবেন? নিরাপত্তা দেন? উত্তর যদি নেতিবাচক হয়, তবে আপনিও এই উম্মাহ চেতনা ধ্বংসের অন্যতম এক কারিগর। আপনিও একবিংশ শতাব্দির শিবাজী’র সহযোগী গাদ্দার!

বিজয়বাংলা/এনএ/১৪/৯/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 27
    Shares